নাম : মোঃ মোফাজ্জল হোসেন

পিতা : মৃত বশিরউদ্দীন

গ্রাম : ধরন্দা,

ডাক : বাংলা হিলি,

ইউনিয়ন : হিলি হাকিমপুর

থানা : হাকিমপুর,

জেলা : দিনাজপুর

শিক্ষাগত যোগ্যতা : অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত

১৯৭১ সালে বয়স : ২১

১৯৭১ সালে পেশা : মুজাহিদ বাহিনী সদস্য

বর্তমান পেশা : ব্যবসা

 

 

 

প্র: ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর আক্রমণ সম্পর্কে আপনি কি শুনেছেন ?

 

উ: আমরা শুনেছি যে, ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাত্রে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ঢাকাতে এবং দেশের বিভিন্ন জাগায় আক্রমণ করে বহু লোককে মাইরে ফেলাইছেএ খবর আমরা পরদিন শুনলামতখন আমাদের মনে খুবই একটা ক্ষোভের সৃষ্টি হলোএই খবর পেয়ে এই এলাকায় আমরা যারা আর্মস ট্রেনিংপ্রাপ্ত ছিলাম তারা সঙ্গে সঙ্গে একত্রিত হওয়া শুরু করলামএকত্রিত হতে আরও একদিন চলে যায়২৭ মার্চ সকাল বেলা হাকিমপুর গার্লস স্কুলে আমরা একটা ক্যাম্প করিসেই ক্যাম্পে আমরা প্রায় ১০০ জন মতো মুজাহিদ এবং আনসার একত্রিত হইকিছু সৈনিকও সেখানে ছিলোএকত্রিত হয়ে আমরা পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলি

 

প্র: ১৯৭১ সালে আপনি আক্রান্ত হয়েছিলেন কি ?

 

উ: আমি সরাসরি আক্রান্ত হয়নিযাই হোক, আমি যেটা বলছিলাম, আমি ২৫শে মার্চে সকাল প্রায় ১০টা থেকে সাড়ে ১০টা হবে, সেই সময় রাস্তার উপর দাঁড়িয়ে ছিলামএই সময় দেখতেছি হাকিমপুর থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবদুল কুদ্দুস মুন্সি সাহেব আমার দিকে আসতেছেনএকই সময় দেখি এক পাঞ্জাবি ইপিআরও আমার এ দিকেই আসতেছেতার কাছে রিভলভার দেখলামআমার সঙ্গে তখন তমিজ নামে এক ছেলে ছিলোআমার এক আত্মীয় সেইপিআর সৈনিকটাকে দেখে আমি মনে মনে ঐ পাঞ্জাবিটাক ধরার সিদ্ধান্ত নিলামতখন আমি এটাও চিন্তা করলাম যে, এখন আমার সামনে একজন মুরুব্বি বা একজন পার্টির নেতা আছে তার কাছে এ বিষয়ে আমার জিজ্ঞেস করা উচিতআমি সঙ্গে সঙ্গে কুদ্দুস মুন্সি সাহেবকে বললাম যে, ভাই ঐ ব্যাটা পাঞ্জাবিক আমি ধরতে চাইআমি কি করবো ? তিনি আমাকে হুকুম দিলেন যে, তুমি তাকে ধরো এবং ধরে তার কাছ থেকে তার হাতিয়ার কেড়ে নাওতখন আমি তমিজকে ইশারা দিলাম, ইশারা দিয়েই আমি পাঞ্জাবি ইপিআর সেনার উপর ঝাঁপিয়ে পড়লামতমিজও আমার সঙ্গে যোগ দিলোঝাঁপিয়ে পড়ে তার কাছ থেকে আমি রিভলভারটা ছিনিয়ে নিলামরিভলভার নিয়েই ওকে সঙ্গে সঙ্গে বাইন্দে ফেললামএরপর সভাপতি আবদুল কুদ্দুস মুন্সি সাহেবের কথামতো তাকে আমাদের এম.পি আবদুল মজিদ সাহেবের বাসায় নিয়ে গেলাম এবং সমস্ত ঘটনা জানালামতখন এখানে একটা কমিটি ছিলোএই কমিটি ডিসিশন নিলো এই পাঞ্জাবিকে কি করা হবেপাঞ্জাবি ইপিআর সৈনিকের স্ত্রীও সেখানে ছিলোওর স্ত্রীও ঐ বাসাতে আসেতার একটা বাচ্চা ছিলোওর স্ত্রীও এবং বাচ্চার কথা চিন্তা করে তাকে প্রাণে মারা হলো নাতখন কমিটির সবাই মিলে একমত হলো যে, এদেরকে ইন্ডিয়াতে পাঠানো হবেতখন ইন্ডিয়ার এক বিএসএফ অফিসারের সঙ্গে যোগাযোগ করে তার হাতেই ওদের দেয়া হলোআমি পরে শুনেছিলাম, বিএসএফ কমান্ডার নাকি তাকে বহরমপুর সেন্ট্রাল জেলে পাঠিয়ে দিয়েছিলো

 

প্র: আপনি কেন মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করলেন ?

 

উ: আমি নিজে একজন মুজাহিদ ছিলামরেগুলার আর্মির সাথে আমাদের ট্রেনিং হতোপাকিস্তান আর্মির সঙ্গে আমরা এক সঙ্গেই ট্রেনিং করেছিখাওয়া-দাওয়াও সব এক সঙ্গে হতোকিন্তু সব সময় লক্ষ্য করতাম, ওদের মধ্যে একটা হিংসা মনোভাবওরা সব সময় আমাদের দূরে সরিয়ে রাখতোআমরা নাকি কিছু করতে পারি নাওদের ভিতরে অহংকার এই যে, তারা বাঙালিদের থেকে অনেক বড়ওরা সব সময় উর্দু ভাষায় আমাদের গালি গালাজ করতোএই গালিগালাজ আমি কেন, কোনো বাঙালি সিপাই-ই সেই সময় বরদাস্ত করতে পারতো নাভিতরে ভিতরে এ রাগটা আমাদের মধ্যে দানা বেঁধে উঠেছিলোএটা একটা কারণ, আর দ্বিতীয় কারণ ছিলো রাজনৈতিকওরা মনে করতো বাঙালিরা কোনোদিন এ দেশ চালাতে পারবে নাশেখ মুজিব বা শেখ মুজিবের লোকজন দেশ কি করে চালাবে ? পরিশেষে বাঙালিদের ওপর তাদের আক্রমণের ব্যাপারটাই সবচেয়ে বেশি কাজ করেছে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করার জন্য

 

প্র: আপনার এলাকায় কখন পাকিস্তানি সেনারা আক্রমণ করলো ?

 

উ: ২৫শে মার্চের পর বেশ কিছু দিন এই এলাকা আমরা মুক্ত রাখছিলামতারপর হঠাৎ একদিন ওরা আক্রমণ করছেসে দিন মঙ্গলবার ছিলোএটা এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি কোনো এক দিনঅনেক দিন হয়ে গেছেসঠিক তারিখটা আমার মনে নাইবেলা আনুমানিক ৩টা সাড়ে ৩টা হবেওদের আক্রমণ ছিলো দক্ষিণ, পূর্ব এবং উত্তর দিক থেকেসাঁড়াশি আক্রমণ করলোতখন এখানে বেঙ্গল রেজিমেন্টের কিছু সৈনিক ছিলোবেঙ্গল রেজিমেন্ট, মুজাহিদ এবং আনসার-পুলিশ যৌথভাবে আমরা ওদের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু করলামযুদ্ধে আমাদের কয়েকজন সৈনিক হতাহত হয়হতাহত হওয়ার পরে এখান থেকে বেঙ্গল রেজিমেন্ট অন্যত্র চলে গেলঠিক জানি না কোথায় গেলোকিন্তু আমরা যাইতে পারি নাইএই জন্য যাইতে পারি নাই যে, আমাদের বাড়ি ঘর সব এখানেইআমরা যাবোই বা কোথায় ? সেটাও তো তখন জানি নাএই চিন্তা করে আমরা স্হানীয় মুজাহিদ, আনসার পুলিশ এবং এখানকার কিছু শিক্ষিত ছেলে পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালায়ে গেলাম তিন দিনআমরা তখন ১০০ জনের মতো ছিলামবেঙ্গল রেজিমেন্ট তো আগেই চলে গেলোতিন দিন যুদ্ধ করার পর আমাদের গোলা বারুদ সব কমে গেলতারপর অনেক ছেলে আমাদের আহত হলোএকটানা যুদ্ধ করার মতো তেমন কেউ থাকলো না  সিভিল যারা ছিলো তারাও সরে পড়লোসবাইকে আমরা গুছাইয়াও রাখতে পারি নাইতবু যতটুকু পারছি তিন দিন আমরা তাদের সঙ্গে সুন্দরভাবেই যুদ্ধ করছিতাদেরকে এখান থেকে হটাইয়াও দিছিবহু দর তারা পিছনে হটে গেছিলোতারপর ওরা আর্টিলারি নিয়া সাঁড়াশি আক্রমণ করেতিন দিন পরে আমরা এই হিলি  এলাকা থেকে উইথড্রো হয়ে পিছনে চইলা যাইপরে সব ভারতে চইলা গেলাম

 

প্র: এরপর পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী আপনার এলাকায় কি করলো ?

 

উ: পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী এরপরে তো সব দখল করে নিলোদখল করে নিয়ে অত্যাচার শুরু করলোএ কথা এখন মনে হলে চিন্তাই করা যায় না যে মানুষ মানুষের প্রতি এমন নির্দয় ব্যবহার করতে পারেশিশু, যুবক, বৃদ্ধ, বৃদ্ধা, নারী-শিশু যাকে সামনে পেলো তাকে তারা হত্যা করলোনারী ধর্ষণ করলোঅগ্নি সংযোগ করলোএটা নয় মাসই ছিলোআমরা ইন্ডিয়ায় যাবার পর ক্যাম্পে আশ্রয় নিলামসেটা বর্ডারের কাছেই একটা জায়গায়সেখান থেকে বাংলাদেশের খানিকটা অংশ দেখা যেতোআমার বাড়ির দক্ষিণ দিকে একটা রাইছ মিল ছিলোরাইছ মিলের দোতলায় পাকিস্তান আর্মির একটা ক্যাম্প ছিলোইন্ডিয়া থেকে লক্ষ্য করতাম যে, তারা প্রায়ই ওখানে মেয়েদের ধরে নিয়া আসছেতারা ওখানে মেয়েদের ভোগ করতো, অত্যাচার করতো বলে শুনছিএমন কি শোনা গেছে যে, মেয়েদের ভোগ করার পর মেয়েদের বুকের স্তন তারা কেটে ফেলেছেএই এলাকায় ওদের অনেক আন্ডারগ্রাউন্ড ঘাঁটি ছিলোশাহড়ায় একটা আন্ডারগ্রাউন্ড ঘাঁটি ছিলোআমরা সেই আন্ডার গ্রাউন্ড ঘাঁটি দখল করলে সেখানে রক্তাক্ত অবস্হায় কয়েকজন মেয়েকে পাওয়া গিয়েছিলো

 

প্র: সেই সময় আপনার পরিবারের কেউ শহীদ হয়েছে কি ?

 

উ: না, আমার পরিবারের কেউ শহীদ হয়নি

 

প্র: আপনার এলাকায় কখন থেকে মুক্তিবাহিনীর তৎপরতা শুরু হয় ?

 

উ: আমার এলাকায় মুক্তিবাহিনীর তৎপরতা প্রথম তো মার্চ মাসেই শুরু হইছেবঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণের পর থেকেই প্রস্তুতি শুরু হইছেএরপর পাকিস্তানিরা সব দখল করে নিলে নতুন করে শুরু হয় মে-জুনের দিকে

 

প্র: তখন মুক্তিবাহিনী সম্পর্কে জনগণের মনোভাব কেমন ছিলো ?

 

উ: মুক্তিবাহিনী বলতে যে একটা কিছু হবে, এই ধরনের চিন্তা জনগণের মধ্যে ছিলো নাআমরা খান সেনাদের  উপরে যে একটা আঘাত হানবো, অন্যায়ের প্রতিবাদ করবো সেটা ভাবিনিপরে সেটা ভাবতে হলোতখন জনগণ সব দিক দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করা শুরু করলোজনগণের মনোভাব ভালো ছিলো

 

প্র: আপনার গ্রাম বা এলাকায় কারা রাজাকার ছিলো ?

 

উ: সত্য কথা বলতে কি আমাদের এখানে হিলিতে ধরেন তিন মাইলের ভিতরে তেমন কোনো লোকজন ছিলো নাবেশিরভাগ লোক তো ইন্ডিয়ায় শরণার্থীকিছু কিছু লোক ছিলোতারা এখান থেকে পলায়ে দেশের ভিতরেই অন্যত্র চইলা গেছিলোআমাদের এখানে কোনো রাজাকার ছিলো নাআমাদের এখানে যে সব রাজাকার ছিলো তারা অন্য এলাকারতাদের নাম আমি জানি না

 

প্র: যুদ্ধের শেষে এলাকায় ফিরে এসে কি অবস্হা দেখলেন ?

 

উ: আমাদের কারো ঘরবাড়ি ছিলো নাসব সমান, শুধু মাটি, আর জঙ্গলএকটাও ঘর বাড়ি ছিলো নাহিলিতে এখন যা দেখছেন এ গুলান কিছু ছিলো না

 

প্র: স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ?

 

উ: কিছু ছিলো নাস্কুল-কলেজ, মসজিদ, মাদ্রাসা বাড়িঘর কিছু ছিলো নাসব সমানসব ধ্বংস হয়া গেছিলোশুধু রেলের কয়েকটা কোয়ার্টার ছিলোওখানে খান সেনারা ছিলোব্রিজ ভাঙাকিছু আমরাও ভাঙেছি, কিছু ওরাও ভাঙিছে

 

 

 

সাক্ষাৎকার গ্রহণকারীর নাম : আবদুল কাইয়ুম

সাক্ষাৎকার গ্রহণের তারিখ : অক্টোবর ২২, ১৯৯৬

ক্যাসেট নম্বর : ৬৫