ইখতিয়ারউদ্দীন মুহম্মদ বিন বখতিয়ার খালজীর বঙ্গবিজয়

(১২০০-১২০৬ খ্রিস্টাব্দ)

 

                            - ডক্টর সুশীলা মণ্ডল,

                              এম-এ, ডি-ফিল,

                              অধ্যক্ষা,

                              রাজা নরেন্দ্রলাল খান মহিলা মহাবিদ্যালয়

                              (মেদিনীপুর)

 

 

 

সূচনা

 

দ্বাদশ শতাব্দীর শেষার্ধে মধ্য এশিয়ার বিভিন্ন জাতি স্থানচ্যুত উল্কার মত দুর্জয় বেগে দুর্গম পর্বত, অরণ্য, উপত্যকা অতিক্রম করিয়া দেশ-দেশান্তরে ছুটিয়া লিয়াছেদেহে তাহাদের অসীম শক্তি, হৃদয়ে তাহাদের অদমনীয় সাহস, আননে আশার দীপ্তি, হস্তে উন্মুক্ত তরবারিএই সকল দুর্ধর্ষ যাযাবর জাতি সেলজুক সাম্রাজ্য বিধ্বস্ত করিয়া ক্রমে ক্রমে খোরাসান, সিস্তান ও আফগানিস্তান অধিকার করিলএই অঞ্চলের অধিবাসীরা ছিল তাহাদেরই সমগোত্রীয় তুর্কীজাতীয় খ্রিস্টীয় দশম শতক হইতেই তাহারা এই অঞ্চলে বসতি স্থাপন করিয়াছিল সুলতান মামুদের মৃত্যুর পর হইতেই এই অঞ্চলে তুর্ক শক্তি ম্রিয়মাণ এবং স্তিমিতপ্রায় হইয়া পড়িয়াছিল নবাগত এই সকল যাযাবর জাতির আগমনে এবং তাহাদের প্রাণশক্তির উচ্ছলতায় পুনরায় এই স্তিমিতপ্রায় জাতির দেহে প্রাণ সঞ্চার হইল: তাহারা পুনরায় উদ্দীপ্ত হইয়া উঠিল; সুদীর্ঘ সার্ধ শতাব্দী পরে আবার এজাতি বিজয়াভিযানে বহির্গত হইলএই ভাগ্যান্বেষী জাতির বিজয়াকাঙ্খা সার্থক রূপ পরিগ্রহ করিল সিন্ধুর পূর্বতীরে এবং অতি স্বল্পকাল মধ্যেই সমগ্র উত্তর ভারতে ইসলামের বিজয় পতাকা উড্ডীন হইল ইখতিয়ারউদ্দীন মুহম্মদ খালজী ছিলেন এই যাযাবর গোষ্ঠীর সন্তান

 

ইখতিয়ারউদ্দীন মুহম্মদ ছিলেন জাতিতে তুর্কী, বংশে খালজী এবং বৃত্তিতে ভাগ্যান্বেষী সৈনিক তাঁহার পিতৃভূমি ছিল সিস্তানের পূর্ব সীমান্তবর্তী ঘুর এবং গরমশির অঞ্চল (বর্তমান দস্ত-ই-মার্গ= পথনির্দেশক); সুতরাং বসতিতে তিনি ছিলেন আফগানগর্ব করিবার মত পিতৃপরিচয় বংশগৌরব তাঁহার ছিল না কিন্তু তিনি ছিলেন উচ্চাভিলাষী এবং দুর্জয় সাহসী স্বীয় কর্মশক্তির উপর নির্ভর করিয়া ইখতিয়ারউদ্দীন ভাগ্যান্বেষণে বহির্গত হইলেনতিনি গজনীতে উপস্থিত হইয়া শিহাবউদ্দীন ঘুরীর অধীনে সৈন্যবিভাগে কর্মপ্রার্থী হইলেন ইখতিয়ারউদ্দীন ছিলেন খর্বাকৃতি, দীর্ঘবাহুএই দুইটি লক্ষণের সমাবেশ তুর্কী সমাজে অকল্যাণের ইঙ্গিত বহন করিত: সুতরাং মুহম্মদ ইখতিয়ারউদ্দীনের প্রার্থনা প্রত্যাখ্যাত হইলইহা বোধহয় নিয়তিরই বিধান; তাহা না হইলে ভবিষ্যৎ বঙ্গবিজেতা হয় তো গজনী অঞ্চলেই জীবন অতিবাহিত করিতেন

 

গজনীর দরবারে প্রত্যাখ্যাত হইয়া মুহম্মদ ইখতিয়ারউদ্দীন ভারতের পথে অগ্রসর হইলেন কুতুবউদ্দীন তখন দিল্লিতে শিহাবউদ্দীন ঘুরীর প্রতিনিধি ইখতিয়ারউদ্দীন কর্মপ্রার্থী-রূপে দিল্লির দরবারে উপস্থিত হইলেন, কিন্তু কুতুবউদ্দীনও তাঁহাকে স্বচ্ছন্দমনে গ্রহণ করিতে পারিলেন নাএই ক্ষেত্রেও প্রতিবন্ধক হইল মুহম্মদ ইখতিয়ারউদ্দীনের খর্ব দেহ এবং দীর্ঘ বাহু

 

প্রত্যাখ্যাত ইখতিয়ারউদ্দীন হতোদ্যম হইলেন নাতিনি পূর্বাঞ্চলের পথে অগ্রসর হইলেন যথার্থ সৈনিক একবার অগ্রসর হইলে কখনও পশ্চাতে পদক্ষেপ করে না ইখতিয়ারউদ্দীন বদায়ূনে উপস্থিত হইলেন বদায়ুন অঞ্চল ছিল মহারাজ পৃথীরাজের রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত পৃথীরাজের পরাজয় ও মৃত্যুর পর তাঁহার রাজ্যখণ্ড বিভিন্ন মুসলিম আমীরের মধ্যে বন্টন করিয়া দেওয়া হইয়াছিল মালিক হিজবরউদ্দীন ছিলেন বদায়ুনের সিপাহসালার বা শাসনকর্তা বদায়ুন ব্যতীত গঙ্গা-যমুনার মধ্যবর্তী দোয়ার এবং গঙ্গার পূর্বতীরবর্তী বিস্তীর্ণ অঞ্চল তাঁহার অধীনে ছিল হিজবরউদ্দীনের অধীনে মাত্র বেতনভোগী সৈনিকরূপে ইখতিয়ারউদ্দীন জীবন আরম্ভ করিলেন শিগগির তিনি পার্শ্ববর্তী হিন্দু সামন্তবর্গের বিরুদ্ধে প্রেরিত হইলেন এবং প্রভৃত শৌর্য ও বীরত্বের পরিচয় প্রদান করিলেন কিন্তু তথাপি তিনি জায়গীরদার পদের উপযুক্ত বিবেচিত হইলেন না

 

ইখতিয়ারউদ্দীনের মতো উচ্চাভিলাষী ব্যক্তি সামান্য বেতনভোগী সৈনিকের পদে তৃপ্ত থাকিতে পারেন নাই সুতরাং অল্পকাল পরেই তিনি বদায়ুন পরিত্যাগ করিয়া অযোধ্যার শাসনকর্তা হুসামউদ্দীনের অধীনে পর্যবেক্ষণের কার্যে নিযুক্ত হইলেন। (১১৯৭ খ্রিঃ) ইখতিয়ারউদ্দীনের সাহস ও বুদ্ধিমত্তায় সন্তুষ্ট হইয়া হুসামউদ্দীন তাঁহাকে বর্তমান মির্জাপুর জিলাল পূর্ব-দক্ষিণ কোণে ভাগবত ও ভূইলী নামক দুইটি পরগণার জায়গীর প্রদান করিলেন এই অঞ্চলে ইতিপূর্বে আর কোনো মুসলিম সৈনিকের পদার্পণ হয় নাইএই দূরবর্তী অঞ্চলে জায়গীর প্রদানের পশ্চাতে আরও একটি উদ্দেশ্য ছিল অযোধ্যার শাসনকর্তা হুসামউদ্দীন ছিলেন বিচক্ষণ ব্যক্তিতিনি সম্ভবত ইখতিয়ারউদ্দীনের বুদ্ধিমত্তা ও সাহসের পরিচয় পাইয়া এই উচ্চাভিলাষী সৈনিককে স্বীয় শক্তিকেন্দ্র হইতে দূরে রাখাই সমীচীন বিবেচনা করিয়াছিলেনযাহা হউক, মুহম্মদ ইখতিয়ারউদ্দীন এইবার তাঁহার উপযুক্ত কর্মক্ষেত্রের সন্ধান পাইলেন

 

বর্তমান চুণারের এগার মাইল পূর্বে এবং মির্জাপুর হইতে ত্রিশ মাইল দূরে বিন্ধ্যপর্বতমালার উত্তর-সানুদেশে ভুইলী গ্রাম চুণার গড়ের নিকটে গঙ্গা ও কর্মনাশা নদীর মধ্যবর্তী অঞ্চলে দুইটি পরগনা এখনও ভাগবত ও ভুইলী নামে পরিচিত অবশ্য বিভিন্ন ইতিহাসে এই দুইটি স্থান বিভিন্ন নামে উল্লিখিত হইয়াছে বক্‌র্শী নিজামউদ্দীন আহম্মদের তবকাৎ-ই-আকবরীতে কম্পিলা ও পতিয়ালী নামের উল্লেখ আছে বদায়ুনীর মুন্‌তাখাব-উৎ-তাওয়ারিখ গ্রন্থেও কম্পিলা ও পতিয়ালী নাম দেখা যায় গোলাম হুসেন সলিমের রিয়াজ-উস-সালাতীনে কম্বালা ও বেতালী নামের উল্লেখ রহিয়াছে কম্পিলা (সম্ভবত কুন্তিলা) এবং পতিয়ালী (সম্ববত পতিলা বা বেতালীর শুদ্ধ নাম) ভাগবত ও ভুইলীর সন্নিকটে অবস্থিত ক্রমে এই ভাগবত এবং ভুইলী মুহম্মদ ইখতিয়ারউদ্দীনের শক্তিকেন্দ্র হইয়া উঠিল প্রথমেই তিনি গাহড়বালের সামন্ত নরপতিদিগকে পরাজিত করিলেন এবং তারপর মুনের (বর্তমান পাটনা জিলার অন্তর্গত) এবং বিহার (বর্তমান বিহার শরিফ) অঞ্চলের বহুস্থান লুণ্ঠন করিলেনএই সময়ে নববিজিত হিন্দুস্থানে বহু তুর্কী ও খালজীজাতীয় লুণ্ঠনলোভী ভাগ্যান্বেষী অভিযাত্রী পরিভ্রমণ করিত মুহম্মদ ইখতিয়ারউদ্দীনের সাফল্যে ও বীর্যবত্তার আকৃষ্ট হইয়া ইহাদের মধ্যে অনেক ভ্রাম্যমাণ লুণ্ঠনলোভী মুসলিম তাঁহার সহিত যোগদান করিল এবং তাঁহার বশ্যতাও স্বীকার করিল

 

ইখতিয়ারউদ্দীনের শক্তি ও সাহসের কাহিনী দিল্লিতে কুতুবউদ্দীনের নিকট অশ্রুত রহিল না ইখতিয়ারউদ্দীন প্রত্যক্ষভাবে কুতুবউদ্দীনের আইবকই ভারতের মুসলিম নেতারূপে বিবেচিত হইতেন কুতুবউদ্দীন উদীয়মান ইখতিয়ারউদ্দীনের প্রশংসা করিয়া তাঁহাকে উৎসাহিত করিলেন এবং তাঁহাকে ইসলামের প্রচারক বলিয়া অভিনন্দিত করিলেন এবং অভিনন্দনের চিহ্নস্বরূপ তাঁহাকে খিলাত প্রেরণ করিলেন ইখতিয়ারউদ্দীন এই অভিনন্দন, উপাধি ও খিলাত গ্রহণ করিলেন অর্থাৎ পরোক্ষভাবে ইখতিয়ারউদ্দীন কুতুবউদ্দীনের প্রাধান্য স্বীকার করিলেন এইবার বিনা দ্বিধায় মুসলমানগণ ইখতিয়ারউদ্দীনের সহিত যোগদান করিল; কারণ ইখতিয়ারউদ্দীনের কার্যাবলী ভারতে ইসলামের কর্ণধার কতুবউদ্দীনের স্বীকৃতি ও সমর্থন লাভ করিয়াছে; ইখতিয়ারউদ্দীনের বিজয় ইসলামের বিজয় বলিয়াই গৃহীত হইয়াছে; ইখতিয়ারউদ্দীন ইসলামের সৈনিক বলিয়া অভিনন্দিত হইয়াছেন সুতরাং তাঁহার সহিত বিজয়াভিযানে যোগদান করিলে বিজয়ী মুসলিম সৈন্যগণ ইহকালে লুণ্ঠনের অংশ এবং সমরে মত্যুবরণ করিলে পরকালে স্বর্গলাভ করিবে সুতরাং ইহকাল এবং পরকালের লাভের আকাঙ্ক্ষায় দলে দলে ভ্রাম্যমাণ তুর্ক-খালজী সৈন্য ইখতিয়ারউদ্দীনের সহিত যোগদান করিল কুতুবউদ্দীন কর্তৃক খিলাত প্রেরণের পূর্বে মুসলিম সৈনিকগণের মনে যে দ্বিধা ছিল, তাহাও নি:শেষে দূর হইয়া গেল ইখতিয়ারউদ্দীন নবোদ্যমে সমরাভিযানে প্রবৃত্ত হইলেন

 

ইখতিয়ারউদ্দীন উচ্চাভিলাষী এবং দুর্জয় সাহসী ছিলেন তাঁহার দূরদৃষ্টি এবং বিচক্ষণতার অভাব ছিল না এবং স্বীয় সৈন্যবল সন্বন্ধেও তিনি যথেষ্ট সচেতন ছিলেন সুতরাং কোনো শক্তিশালী নরপতির বিরুদ্ধে অভিযান করিয়া স্বীয় স্বার্থকে ক্ষুণ্ন করা বা দেশব্যাপী চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করা তাঁহার উদ্দেশ্য ছিল না তাঁহার প্রধান লক্ষ্য ছিল লুণ্ঠন ও ধনসম্পদ লাভসেই সময়ে উত্তর বিহারের মিথিলায় (গগুক ও কুশী নদী নদীর মধ্যবর্তী অঞ্চল) কর্ণাটক হইতে আগত একটি হিন্দু রাজবংশ রাজত্ব করিতেছিল কনৌজের সিংহাসনে তখন জয়চন্দ্রের পুত্র হরিশ্চন্দ্র সমাসীন রোহতাস অঞ্চলের হিন্দু মহানায়কগণ তখনও তাঁহাদের স্বাতন্ত্র্য অক্ষুণ্ন রাখিয়াছিলেন তাঁহাদের সামস্ত মহামালিক উদয়রাজ শোন নদীর তীরবর্তী অঞ্চল নবনেরাপত্তনে আধিপত্য করিতেন সুতরাং এই সকল হিন্দু নরপতিদের বিরুদ্ধে অভিযান প্রেরণ করিয়া বিপদ ও বিপ্লব সৃষ্টি করিতে তিনি প্রস্তুত ছিলেন নাঅতএব যে স্থানে রাজশক্তি দুর্বল, শিথিল অথবা রাজা অনুপস্থিত ছিলেন, সেই সকল স্থান লুণ্ঠন করাই তাঁহার উদ্দেশ হইল তাঁহার কর্মক্ষেত্র হইল প্রধানত দক্ষিণ বিহার-এই সময়ে তিনি বর্তমান পাটনার নিকটবর্তী স্থান এবং বিহার নগর পর্যন্ত অগ্রসর হইয়াছিলেন বৎসরাধিক কাল এইভাবে হিন্দুরাজ্য, গ্রাম ও নগর লুণ্ঠন ও বিধ্বস্ত করিয়া ইখতিয়ারউদ্দীন প্রচুর অর্থ ও ধনসম্পদ সংগ্রহ করিলেন এবং নূতন সেনাদল গঠন করিলেন ইখতিয়ারউদ্দীন নবগঠিত সেনাবাহিনী লইয়া গোবিন্দপালদেবের রাজধানী আক্রমণ করিলেন গোবিন্দপালদেব চিরশত্রু  গৌড়েশ্বর সেনরাজের নিজ হইতে কোনোরূপ সাহায্য না পাইয়া স্বীয় স্বল্পসংখ্যক সৈন্য লইয়া ওদন্তপুরের দুর্গম, সুরক্ষিত, শৈলশিখরস্থিত সংঘারামে আশ্রয় গ্রহণ করিলেন ইখতিয়ারউদ্দীন সসৈন্যে বিহার দুর্গের সম্মুখে উপস্থিত হইলেন (১১৯৯ খ্রিঃ)এই মহাবিপদের সময়ে সংঘারামের বৌদ্ধভিক্ষুগণ জাতি, ধর্ম ও প্রাণ রক্ষার্থ অস্ত্রধারণ করিলেন; কিন্তু সুশিক্ষিত রণনিপুণ মুসলিম সৈন্যের সহিত যুদ্ধে তাঁহার পরাজিত হইলেন-গোবিন্দপালদের নিহত হইলেন মুহম্মদ ইখতিয়ারউদ্দীন বিহার দুর্গ অধিকার করিলেন দুর্গের অধিবাসীগণ অধিকাংশই নিহত হইল, যুগযুগ-সঞ্চিত ধনরাশি লুষ্ঠিত হইল এবং বহু গ্রন্থ ভস্মীভূত করা হইল ইখতিয়ারউদ্দীন কর্তৃক নিহত দুর্গ বা হিবারবাসীরা অধিকাংশই ছিলেন মুণ্ডিতকেশ পীতবসন বৌদ্ধভিক্ষু ওদন্তপুরের মঠ সাধারণের নিকট বিহার নামেই পরিচিত ছিল সুতরাং এই বিহার নামানুসারেই সমগ্র প্রদেশটিকে মুসলিমগণ বিহার নামে আখ্যায়িত করিল অবশ্য এক সময়ে এই অঞ্চলে বৌদ্ধ-বিহারও ছিল অগণিত

 

ওদন্তপুর ধ্বংসের প্রায় একবৎসর পরে মুহম্মদ ইখতিয়ারউদ্দীন পুনরায় বিহার অঞ্চলে সমরাভিযান করিয়া ঐ অঞ্চলে স্বীয় আধিপত্য স্থাপনের চেষ্টা করিলেন (১২০০ খ্রিঃ) এইবার মুহম্মদ ইখতিয়ারউদ্দীন এই অঞ্চলে লুণ্ঠন অপেক্ষা আধিপত্য স্থাপনেই সচেষ্ট হইলেনতিনি স্থানে স্থানে সেনানিবাস স্থাপন করিলেন এবং বিজিত অঞ্চলের জন্য শাসনব্যবস্থাও রচনা করিলেন প্রসিদ্ধ কাশ্মিরী বৌদ্ধভিক্ষু শাক্য শ্রীভদ্র এই সময়ে ভ্রমণব্যপদেশে এবং তীর্থদর্শন-মানসে মগধে আগমন করিয়াছিলেনতিনি ওদন্তপুর এবং বিক্রমশীলা বিহারে ধ্বংসস্তূপই দর্শন করিয়াছিলেনএই ধ্বংসলীলা দর্শনে ক্ষুব্ধ এবং মগধে তুর্কীজাতির সংখ্যাধিক্য দর্শনে ভীত ও সন্ত্রস্ত হইয়া তিনি বিহার পরিত্যাগ করেন এবং উত্তরবঙ্গের জগদ্দল বিহারে আশ্রয় গ্রহণ করেন মুসলমানের অত্যাচারে মগধের বহু নরনারী এবং বৌদ্ধ শ্রমণ দেবমূর্তি ও র্মগ্রন্থসহ নেপাল ও নেপালের নিকটবর্তী পর্বতময় দুর্গম হিন্দুরাজ্যে পলায়ন করিয়াছিল মুসলিম ইতিহাসকার আমীর আলীর বর্ণনা হইতে অনুমতি হয় যে, তৎকালে মুসলিমগণ হিন্দু অপেক্ষা বৌদ্ধগণের প্রতি অধিকতর বিদ্বেষভাবাপন্ন ছিলকারণ, দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে এশিয়ার বৌদ্ধধর্মাবলম্বী তুর্কীজাতি আরব সাম্রাজ্য ধ্বংসোদ্দেশ্যে অভিযান করিয়াছিল এবং মুসলিমদিগকে পরাজিত করিয়া বৌদ্ধ হুলাগু খান (হালকু) বাগদাদ নগর অধিকার করিয়াছিলেন

 

 

নবদ্বীপ অভিযান

 

অতঃপর ইখতিয়ারউদ্দীন তাঁহার বিজয়বাহিনীসহ আরও পূর্বদিকে অগ্রসর হইলেন এবং ১২০০ খ্রিষ্টাব্দের গ্রীস্মকালে অকস্মাৎ বঙ্গের রাজনিবাস নদীয়া নগরীর দ্বারে আসিয়া উপস্থিত হইলেনকারণ, বঙ্গাধিপতির ধনৈশ্বর্যের কাহিনী তাঁহাকে প্রলুব্ধ করিয়াছিল বঙ্গাধিপতি লক্ষণসেন তখন পুণ্যার্থীরূপে গঙ্গাতীরবর্তী নদীয়া বা নবদ্বীপ নগরীতে বাস করিতেছিলেন নবদ্বীপ কোনোকালেই বঙ্গের স্থায়ী রাজধানী ছিল কি না, বলা সুকঠিন কিন্তু সেন-নরপতিগণ ছিলেন ব্রাহ্মণ্য ধর্মকর্ম ও আচার অনুষ্ঠানের গভীর অনুরাগী সুতরাং গঙ্গাতীরে বা করাকে তাঁহারা অত্যন্ত পুণ্যকর্ম মনে করিতেন পুণ্যার্থী সেন-নরপতিগণের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে বহু ধনৈশ্বর্যশালী ব্যক্তিও পুণ্যলোভে গঙ্গার তীরে নবদ্বীপে আসিয়া বসবাস আরম্ভ করেনফলে, গঙ্গার উভয় তীরে প্রায় তিন ক্রোশব্যাপী অঞ্চলে বহু সমৃদ্ধ ব্যক্তির আবাস নির্মিত হইয়াছিল কিন্তু এই সকল আবাস ইষ্টকনির্মিত প্রাসাদ বা অট্টালিকা নহে-বঙ্গের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী বাঁশ ও খড়-নির্মিত গৃহ মাত্র নগরের চতুর্দিকে প্রাচীর অথবা শত্রুর গতি-প্রতিরোধের উপযোগী কোন দুর্গ বা সেনানিবাস ছিল বলিয়া কোথাও উল্লেখ নাই নদীয়া ছিল শান্তিকামী পুণ্যার্থী ব্যক্তিদের শান্তির নীড়

 

পশ্চিমদিক হইতে বঙ্গে অভিযানের সহজ এবং স্বাভাবিক পথ ছিল গণ্ডক ও কুশী নদী অতিক্রম করিয়া গঙ্গার উত্তর তীর অনুসরণ করিয়া অযোধ্যা-ত্রিহুতের মধ্য দিয়া কিংবা রাজমহলের নিকটবর্তী তেলিয়াগড়ের সংকীর্ণ গিরিপথে বঙ্গে প্রবেশ প্রথম অধ্যায়ে বঙ্গের ভুপ্রকৃতি ও সীমারেখা আলোচনা প্রসঙ্গে উল্লিখিত হইয়াছে যে, উত্তরবঙ্গ, পূর্ণিয়া ও ত্রিহুত অঞ্চলের মধ্যে কোনো দুর্ভেদ্য প্রাকৃতিক প্রাচীর নাই-এই বিরাট অঞ্চলের ভুপ্রকৃতি এবং জলবায়ুও একই প্রকার সেইজন্যই এক সময়ে পুর্ণিয়া বঙ্গের অন্তর্ভুক্ত ছিল এবং মিথিলার সংস্কৃতি উত্তরবঙ্গকেও স্পর্শ করিয়াছিল-বাঙ্গালীও মিথিলার জ্ঞান-গরিমাকে কেন্দ্র করিয়া গৌরব অনুভব করিতএই কারণেই পরবর্তীকালে ত্রিহুতের নামকরণ হইয়াছিল দ্বারবঙ্গ (দ্বারভাঙ্গা) অর্থাৎ বাংলার প্রবেশদ্বার তেলিয়াগড়ের অব্যবহিত দক্ষিণ হইতেই সাঁওতাল পরগনা ও মানভূম-সিংভূমের পার্বত্য অরণ্যময় গৈরিক মালভূমির আরম্ভএই অঞ্চলেই ছিল হিউয়েন সাং বর্ণিত উষর বনময় জঙ্গল এবং উত্তর-রাঢ় প্রদেশএই অঞ্চলের সাধারণ নাম ছিল ঝাড়খণ্ড বা অরণ্যময় প্রদেশএই অঞ্চল এত গভীর অরণ্যময় ছিল যে, এই অঞ্চলের মধ্য দিয়া কোনো সুগঠিত সুবিশাল সেনাবাহিনী পরিচালনা সম্ভবপর ছিল নাএই ভূখণ্ডে সৈন্যচালনার মত কোনো রাজপথ বা খাদ্যদ্রব্য সংগ্রহ করবার মত কোনো লোকবসতিপূর্ণ গ্রাম বা জনগদ ছিল না সুতরাং বঙ্গের ইতিহাসে তেলিয়াগড় গিরিবর্ত্মের গুরুত্ব ছিল অপরিসীমএই একটিমাত্র সংকীর্ণ গিরিবর্ত্ম রক্ষা করিতে পারিলেই বঙ্গের নিরাপত্তা সম্বন্ধে নিশ্চিন্ত হওয়া যাইত সুতরাং বঙ্গাধিপতিদের লক্ষ্যই ছিল এই তেলিয়াগড় গিরিবর্ত্মের সুরক্ষণ ও সংরক্ষণ মহারাজ লক্ষ্মণসেনও সম্ভবত এই বিষয়ে ত্রুটি করেন নাই সেন-নরপতি লক্ষ্মণসেন সম্ভবত কল্পনাও করতে পারেন নাই যে, মুসলিম অভিযাত্রীদলের পক্ষে তেলিয়াগড়ের সুরক্ষিত গিরিবর্ত্ম অতিক্রম করা সম্ভবপর হইবে কিংবা তাহারা বঙ্গে প্রবেশের এই সহজ স্বাভাবিক পথ তেলিয়াগড়ের গিরিবর্ত্ম পরিত্যাগ করিয়া ঝাড়খণ্ডের দুর্ভেদ্য অরণ্যময় ও দুর্গম পার্বত্যপথে বঙ্গে প্রবেশ করিবে সুতরাং নদীয়া বা নবদ্বীপ সুরক্ষিত করিবার কোন প্রয়োজন তিনি অনুভব করেন নাই

 

মুহম্মদ ইখতিয়ারউদ্দীন ছিলেন দুর্জয় সাহসী ও বিচক্ষণ ব্যক্তিতিনি সম্ভবত বঙ্গ অভিযানের পূর্বেই বঙ্গের অভ্যন্তরীণ অবস্থা ও রক্ষা-ব্যবস্থা সম্বন্ধে তথ্য সংগ্রহ করিয়াছিলেনসেই জন্যই তিনি তেলিয়াগড়ের সুরক্ষিত গিরিপথে বঙ্গে অভিযান করেন নাই কিংবা বঙ্গের প্রকৃত রাজধানী সুদৃঢ় ও সুরক্ষিত গৌড় নগরীও আক্রমণ করেন নাই রাজার পরাজয় তখন দেশের বা রাষ্ট্রের পরাজয় বলিয়াই বিবেচিত হইত সুতরাং তিনি অতর্কিতে অরক্ষিত অবস্থায় পুণ্যকামী বঙ্গাধিপতিকে আক্রমণ করাই সমীচীন বিবেচনা করিলেন দুর্গম পথের ভীতি তাঁহাকে বিচলিত কিংবা আতঙ্কিত করিতে পারে নাইতিনি স্বাভাবিক পথে গঙ্গার উত্তর তীর অনুসরণ করিয়া বঙ্গে প্রবেশ করেন নাইতিনি গঙ্গার দক্ষিণস্থ মুনের হইতে যাত্রা আরম্ভ করিয়া শোনা অতিক্রম করিলেন এবং বিহার শরিফে উপস্থিত হইলেনগয়া ও ঝাড়খণ্ডের মধ্য দিয়া দক্ষিণ-পূর্বে অগ্রসর হইয়া তিনি নবদ্বীপে প্রবেশ করিলেন১০

 

নবদ্বীপ প্রবেশের পূর্বরাত্রি ইখতিয়ারউদ্দীন নবদ্বীপের বিশ মাইল উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত অরণ্যে অতিবাহিত করিয়া প্রভাতে নবদ্বীপ অভিমুখে যাত্রা করিলেনতিনি এত দ্রুতগতিতে অগ্রসর হইলেন যে, মাত্র সপ্তদশ জন অশ্বারোহী সৈনিক তাঁহার অনুসরণ করিতে সমর্থ হইয়াছিল কিংবা তিনি স্বেচ্ছায় এই সপ্তদশ অশ্বারোহী-সমন্বিত ক্ষুদ্র দলটিসহ নদীয়া নগরী অভিমুখে অগ্রসর হইয়াছিলেন; পশ্চাতে আসতেছিল মূল সেনাবাহিনী ইখতিয়ারউদ্দীন ও তাঁহার অনুচরদের পরিধানে ছিল বণিকের পরিচ্ছদ, সঙ্গে অতি তেজস্বী ও বলশালী অশ্ব ইখতিয়ারউদ্দীনের পূর্বেও বণিকদল এই দেশে অশ্ব ও নানাপ্রকার পণ্যসম্ভার লইয়া আগম করিত এবং রাজ-দর্শনের জন্য নগরীর বহির্দেশে প্রতীক্ষা করিতএই ক্ষুদ্র অগ্রগামী দল শান্তগতিতে শান্তভাবেই নগরে প্রবেশ করিল; প্রাসাদ-রক্ষীগণের মনেও কোন প্রকার সন্দেহ জাগ্রত হয় নাই; সুতরাং তুর্কী অগ্রগামী দল বিনা বাধায় প্রাসাদ-তোরণ অতিক্রম করিল ক্রমে দ্বিতীয় এবং তৃতীয় দলও আসিয়া অগ্রগামী দলের সহিত যোগদান করিল

 

তখন বেলা দ্বিপ্রহর মহারাজ লক্ষ্মণসেন মধ্যাহ্নভোজনে নিরত-রক্ষিদল সম্পূর্ণ অসতর্ক বা অর্ধসর্তক; নাগরিকগণও স্নানাহারে ব্যাপৃত - সর্বত্রই একটা শিথিল ভাব মুহম্মদ ইখতিয়ারউদ্দীন এই শিখিলতার এবং অসতর্কতার সুযোগ গ্রহণ করিলেন বণিকের ছদ্মবেশ পরিত্যাগ করিয়া তিনি অকস্মাৎ তরবারি উন্মুক্ত করিলেনতোরণ রক্ষীদল বিমূঢ় হইয়া পড়িল ইখতিয়ারউদ্দীন নিঃসংকোচে রক্ষীদলকে হত্যা করিয়া অন্তঃপুরে প্রবেশের উদ্যোগ করিলেন ইতোমধ্যে ইখতিয়ারউদ্দীনের অবশিষ্ট পশ্চাদ্বর্তী সেনাবাহিনীর একটি বৃহৎ অংশও নগরে প্রবেশ করিয়াছে - নগরে হত্যাকাণ্ড আরম্ভ হইয়াছে, নগর প্রায় অবরুদ্ধ; নাগরিকগণ ভীত, সন্ত্রস্ত ও পলায়নপর প্রাসাদ-তোরণ এবং নগরের মধ্যস্থল হইতে তুমুল আর্তনাদ ও কোলাহলধ্বনি উত্থিত হইল মহারাজ লক্ষ্মণসেন কিংকর্তব্যবিমূঢ় হইয়া পড়িলেন বিধর্মী আক্রমণকারীগণকে প্রতিরোধের কোনো উপায়ও তাঁহারা ছিল না-কারণ, তখন তিনি প্রায় নিরস্ত্র-ভোজনালয়ে কোনো অস্ত্রশস্ত্র ছিল না সুতরাং তিনি বাধ্য হইয়া সপরিবারে গোপনে নগ্নপদে নৌকাযোগে পূর্ববঙ্গ অভিমুখে যাত্রা করিলেন অচিরকাল মধ্যেই ইখতিয়ারউদ্দীনের পশ্চাৎগামী অবশিষ্ট সৈন্যদলও আসিয়া উপস্থিত হইল এবং বিনা বাধায় নবদ্বীপ এবং উহার পার্শ্ববর্তী অঞ্চল অধিকার করিল; মুহম্মদ ইখতিয়ারউদ্দীনের নবদ্বীপ বিজয় সমাপ্ত হইল সপ্তদশ জন অশ্বারোহী সৈন্য লইয়া ইখতিয়ারউদ্দীনের নবদ্বীপ-বিজয় এবং মহারাজ লক্ষ্মণসেনের পলায়ন বৃত্তান্তকে কেন্দ্র করিয়া বহু কলঙ্ককাহিনী রচিত হইয়াছে লক্ষণসেনের ভীরু কাপুরুষ, সেইজন্যই তিনি পশ্চাৎ দ্বারপথে পলায়ন করিয়াছিলেন কিংবদন্তি আছে যে, জ্যোতিষিগণ ভবিষ্যদ্বাণী করিয়াছিলেন, লক্ষণসেনের রাজ্য যবন কর্তৃক বিধ্বস্ত এবং বিজিত হইবে তাঁহারা যবন বিজেতার রূপ বর্ণনাও করিয়াছিলেন এবং ইখতিয়ারউদ্দীনের দেহাকৃতির সহিত সেই বর্ণনার সামঞ্জস্যও ছিল সুতরাং তুর্কী সৈন্যসহ ইখতিয়ারউদ্দীনের আগমনে ভীত ও সন্ত্রস্ত হইয়াই লক্ষণসেন রাজপ্রাসাদ পরিত্যাগ করিয়াছিলেন

 

সমসাময়িক দুইটি ফারসি ইতিহাসে এই ঘটনার উল্লেখ দেখিতে পাওয়া যায়এই ঘটনার প্রথম সাক্ষ্য পাওয়া যায় ঘটনার ষাট বৎসর পরে রচিত দিল্লির ভূতপূর্ব কাজী মীনহাজ-উস-সিরাজের তবকাৎ-ই-নাসিরী গ্রন্থে মীনহাজ লক্ষ্মৌতি বা লক্ষ্মণাবতীতে দুই বৎসর অতিবাহিত করেন এবং দুইজন অতিবৃদ্ধ সুপ্রাচীন সৈনিকের নিকট ইখতিয়ারউদ্দীনের বিহার-বিজয় এবং অন্যান্য বিশ্বস্ত লোকের মুখে নবদ্বীপ-বিজয় তথা বঙ্গ-বিজয়ের কাহিনী শ্রবণ করেন মীনহাজের রচনার একশত বৎসর পরে ইতিহাসকার ইসামী তাঁহার ফুতুহ্‌-উস-সালাতীন নামক গ্রন্থে ইখতিয়ারউদ্দীন কর্তৃক নবদ্বীপ-বিজয়ের একটি বিবরণ লিপিবদ্ধ করেন দুইটি বিবরণ তুলনামূলকভাবে আলোচনা ও বিশ্লেষণ করিলে সমসাময়িক বাঙালি সমাজের মনোবৃত্তি ও মহারাজ লক্ষ্মণসেনের আচরণের ইঙ্গিত পাওয়া যায়

 

ইসামী তাঁহার ফুতুহ্‌-উস-সালাতীনে লিপিবদ্ধ করিয়াছেন-ইখতিয়ারউদ্দীন সিস্তান হইতে আগত বণিকবেশে নবদ্বীপে উপস্থিত হইয়াছিলেনতিনি রায় লখ্‌মনিয়াকে তাতারদেশীয় সুগঠিত তেজস্বী অশ্ব, চীনদেশীয় মহার্ঘ্য বস্ত্র এবং বিভিন্ন দেশীয় দুসপ্রাপ্য পণ্যসম্ভার পর্যবেক্ষণ ও ক্রয়ের জন্য অনুরোধ করিলেনরায় লখমনিয়া পণ্যসম্ভার পরিদর্শনের জন্য কারবান-এ (বণিকদের বিশ্রামাগার বা অশ্বাদির বিশ্রামস্থল) উপস্থিত হইলেন মুহম্মদ ইখতিয়ারউদ্দীন তাঁহাকে মূল্যবান উপটোকন প্রদান করিলেনরাজা অত্যন্ত পরিতৃপ্ত এবং অসন্দিগ্ধ কিন্তু সেই মুহূর্তেই ইখতিয়ারউদ্দীনের ইঙ্গিতে বণিকবেশী মুসলিম সৈন্যগণ হিন্দু রাজসৈন্যদের আক্রমণ করিল রাজার দেহরক্ষীদলও তৎক্ষনাৎ রাজাকে বেষ্টন করিয়া ব্যুহ রচনা করিল তুর্কী সৈন্য ভীত হইয়া পড়িল.....অবশেষে খালজী সৈন্যগণ ঝঞ্জার বেগে হিন্দু রক্ষীদলকে আক্রমণ করিয়া নিহত করিলরাজা ইখতিয়ারউদ্দীনের হস্তে বন্দী হইলেন

 

মীনহাজ-উস্‌-সিরাজ তাঁহার তবকাৎ-ই-নাসিরী গ্রন্থে লিখিয়াছেন-মগধ অধিকারের পর দ্বিতীয় বৎসরে (১২০১ খ্রিষ্টাব্দে) ইখতিয়ারউদ্দীন তাঁহার সৈন্য ব্যবস্থা সম্পূর্ণ করিয়া বিহার (বিহার শরিফ) হইতে সমরাভিযান আরম্ভ করিলেন এবং অকস্মাৎ নদীয়া নগরে প্রবেশ করিলেনতিনি এত দ্রুত অশ্ব পরিচালনা করিলেন যে, মাত্র সপ্তদশ জন অশ্বারোহী ভিন্ন সকলেই পশ্চাতে পড়িয়া রহিল নগরদ্বারে উপস্থিত হইয়া ইখতিয়ারউদ্দীন কাহাকেও আক্রমণ করিলেন না, বরং অতি শান্ত পদক্ষেপে নগরাভ্যন্তরে অগ্রসর হইলেনকেইই কল্পনা করিতে পারে নাই যে, এই অশ্বারোহী দলে স্বয়ং ইখতিয়ারউদ্দীন উপস্থিত আছেন সকলেই ধারণা করিয়াছিল যে, এই নবাগত বণিকদল মহার্ঘ্য অশ্ব বিক্রয়ের উদ্দেশ্যেই নগরে আগমন করিয়াছেরায় লখনমনিয়ার প্রাসাদদ্বারে উপস্থিত হইয়াই ইখতিয়ারউদ্দীন তরবারি কোষমুক্ত করিয়া শত্রুনিধনে তৎপর হইলেনরায় লখমনিয়া তখন মধ্যাহ্ন-ভোজনে নিরত ছিলেন প্রাসাদ-তোরণ এবং নগরের মধ্যস্থল হইতে আর্তনাদ ও চিৎকার-ধ্বনি উত্থিত হইল, অর্থাৎ ততক্ষণে অবশিষ্ট তুর্কী সেনাবাহিনী নগরে প্রবেশ করিয়া লুণ্ঠন ও হত্যাকাণ্ড আরম্ভ করিয়াছেরায় লখমনিয়া যথার্থ সংবাদ পাইবার পূর্বেই ইখতিয়ারউদ্দীন প্রাসাদে প্রবেশ করিয়া হত্যাকাণ্ড আরম্ভ করিলেনরায় লখমনিয়া নগ্নপদে প্রাসাদের পশ্চাৎ দ্বারপথে পলায়ন করিলেন অর্থাৎ ঘটনাটি এত অতর্কিতে সংঘটিত হইয়াছিল যে, ব্যস্ততাবশত পাদুকা গ্রহণেরও সময় বা অবসর তাঁহার হয় নাই

 

মীনহাজ এবং ইসামীর বিবরণে কয়েকটি বিষয়ে সামঞ্জস্য পরিলক্ষিত হয়; যেমন-সপ্তদশ অশ্বারোহীসহ বণিকবেশে ইখতিয়ারউদ্দীনের আগমন, মহারাজ লক্ষণসেনের অসতর্ক অবস্থার সুযোগ গ্রহণ ইত্যাদি কিন্তু সমস্ত ঘটনাটি বিশদভাবে বিশ্লেষণ করিলে মনে হয় যে, নগরে বিদেশী অশ্ব-বিক্রেতার যাতায়াত ছিল বলিয়াই অশ্ব-বিক্রেতার ছদ্মবেশে অষ্টাদশ জন (সপ্তদশ জন অশ্বারোহী ও ইখতিয়ারউদ্দীন স্বয়ং) বণিকবেশী অশ্বারোহীর আগমন কাহারও মনে সন্দেহের উদ্রেক করে নাই পশ্চাদ্বর্তী বৃহৎ খালজী এবং তুর্কী অশ্বারোহী দল যথাসময়ে উপস্থিত হইয়াছিল বলিয়াই অগ্রবর্তী অষ্টাদশ জন অশ্বারোহীর পক্ষে প্রাসাদ ও নগর অধিকার সম্ভবপর হইয়াছিল অবশ্য যুগলযুগের প্রাসাদ কিংবা দুর্গনগর বলিতে যাহা বুঝায় নবদ্বীপে সেই সময়ে তেমন সুরক্ষিত প্রাসাদ-দুর্গ ছিল না কিন্তু ইসামী বলেন, লক্ষ্মণসেন বন্দী হইয়াছিলেন; মীনহাজ বলেন, তিনি পলায়ন করিয়াছিলেন ঐতিহাসিক রাখালদাস বলেন, মীনহাজ বর্ণিত রায় রখমনিয়া ও লক্ষ্মণসেন সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যক্তি

 

বিধুভূষণ ভট্টাচার্য মহাশয় তাঁহার হুগলী ও হাওড়ার ইতিহাস নামক গ্রন্থে ইখতিয়ারউদ্দীন কর্তৃক নবদ্বীপ ও গৌড়বিজয়ের কাহিনী লিপিবদ্ধ করিয়াছেন-বিহারদেশ অধিকার করিয়া বখতিয়ার সুজলা-সুফলা সমৃদ্ধিশালিনী গৌড়ভূমির প্রতি লোলুপ দৃষ্টিপাত করিতে লাগিলেন পরাক্রান্ত গৌড়বাহিনীর সহিত সম্মুখ সমরে বিজয়লাভ অসম্ভব মনে করিয়া বখতিয়ার বোধ হয় কোনো সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন এবং বিহারের সন্নিকটবর্তী রাঢ়ের শাসনকর্তা বিশ্বরূপ কিংবা কেশবের সহিত ষড়যন্ত্র করিয়া প্রথমে বৃদ্ধ লক্ষ্মণসেন জ্যেষ্ঠপুত্র মাধবের হস্তে রাজধানী লক্ষ্মণাবতী ও উত্তর-গৌড় এবং অপর দুই পুত্র বিশ্বরূপ ও কেশবের হস্তে রাজ্যের পশ্চিম ও পূর্বাংশ অর্পণ করিয়া শেষ বয়সে ইষ্টদেব মুরাবির সান্নিধ্যে গঙ্গাতীরস্থ নদীয়া নগরে ধর্মচর্চায় কালাতিপাত করিতেছিলেন১৪

 

বিশ্বরূপ ও কেশব সম্ভবত গৌড় সিংহাসনের ভাবী উত্তরাধিকারী বৈমাত্রের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা মাধ্যবসেনকে রাজ্যাধিকার হইতে বিচ্যুত করিবার জন্যই ইখতিয়ারউদ্দীনের সঙ্গে ষড়যন্ত্র করিয়াছিলেন এবং বৃদ্ধ রাজা লক্ষ্মণসেনের বিরুদ্ধে সৈন্য পরিচালনায় ইখতিয়ারউদ্দীনকে উৎসাহিত করিয়াছিলেনকারণ, লক্ষ্মণসেনের জীবিতাবস্থায় মাধবসেন শক্তিশালী হইলে তাঁহাকে রাজ্যভ্রষ্ট করা কঠিন হইবে রাজ্যলোলুপ ইখতিয়ারদ্দীনও এই সুযোগের অপব্যবহার না করিয়া অচিরে সসৈন্যে নবদ্বীপ লুণ্ঠনে অগ্রসর হইলেন অধিকাংশ সৈন্য পশ্চাতে রাখিয়া মাত্র সপ্তদশ জন অশ্বারোহী সৈন্য লইয়া ইখতিয়ারউদ্দীন নবদ্বীপে লক্ষণসেনের রাজপ্রাসাদ আক্রমণ করেন

 

ষড়যন্ত্রকারীগণ নিশ্চিত হইয়াছিলেন যে, লক্ষণসেনকে হস্তগত বা নিহত করিতে না পারিলে গৌড়বিজয় অসম্বব হইবে এবং সমস্ত ষড়যন্ত্র প্রকাশ হইয়া পড়িবেকারণ, ইখতিয়ারউদ্দীন গৌড়ের রাজধানী লক্ষণাবর্তী আক্রমণ করিলেই মাধবসেন গৌড়ীয় সেনাবাহিনী লইয়া শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিতে প্রস্তুত হইবেন এবং লক্ষ্মণসেনও রাজধানীতে উপস্থিত হইয়া কেশব এবং বিশ্বরূপকে দেশের শত্রু বিধর্মী ইখতিয়ারউদ্দীনের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করিতে নির্দেশ দিবেন সেইজন্যই ইখতিয়ারউদ্দীন বিহারের অধিকতর নিকটবর্তী এবং সুগম সেনরাজধানী লক্ষণাবতী আক্রমণ না করিয়া লক্ষ্মণসেনকে পরাভূত করিবার উদ্দেশ্যে ছদ্মবেশে নদীয়ায় গমন করেন এবং অতর্কিতে প্রাসাদ-রক্ষীদের আক্রমণ করেন প্রাসাদ-রক্ষীদের সহিত ইখতিয়ারউদ্দীনের যুদ্ধের অবকাশে লক্ষ্মণসেন প্রাসাদের পশ্চাৎ দ্বারপথে পূর্ব বাংলা অভিমুখে প্রস্থান করেন রক্ষ্মনসেন যতদিন জীবিত ছিলেন, ততদিন তাঁহার রাজ্যের অন্য কোনো অংশ আক্রমণ করিতে ইখতিয়ারউদ্দীন সাহস করেন নাই লক্ষণসেনের মৃত্যুর পর কেশবসেন ও বিশ্বরূপসেনের সহায়তায় মাধবসেনকে সিংহাসনচ্যুত করিয়া ইখতিয়ারউদ্দীন লক্ষ্মণাবতী অধিকার করেন সুতরাং লক্ষ্মণসেনের ভীরুতায় নবদ্বীপ বা লক্ষ্মণাবতী মুসলিম পদানত হয় নাই গুপ্ত ষড়যন্ত্র না থাকিলে মুসলিম সৈন্য বিনা বাধায় মগধ হইতে নবদ্বীপে আসিতে পারিত না, কিংবা ইখতিয়ারউদ্দীনও এমন অসমসাহসিক কার্যে প্রবৃত্ত হইতে সাহস করিতেন না লক্ষণসেনের পুত্র-ত্রয়ের মধ্যে বিরোধবশত কিংবা রাজ্যলোভী সামন্ত বা প্রধান ব্যক্তিগণের সাহায্যেই ইখতিয়ারউদ্দীন নির্বিরোধে নদীয়ায় আগমণ ও তথা হইতে নির্বিঘ্নে প্রত্যাবর্তন করিতে সমর্থ হইয়াছিলেন

 

মীনহাজ ও ইসামীর বর্ণনার সত্যতা অস্বীকার করা চলে না, এবং তাঁহাদের বর্ণিত অবস্থার পটভূমিকায় ইখতিয়ারউদ্দীনের নবদ্বীপ-বিজয় কিছু বিস্ময়কর ঘটনাও মনে হয় না কিংবা মহারাজ লক্ষণসেনের ভীরুতাও কিছু প্রমাণিত হয় না কিন্তু তবুও মনে প্রশ্নের উদয় হয় যে, ইখতিয়ারউদ্দীন কর্তৃক বিহার ধ্বংস এবং মগধ জয়ের কাহিনী তো লক্ষ্ণসেনের অজ্ঞাত ছিল না, বৎসরাধিককাল সময়ও তিনি পাইয়াছিলেন; তবে কেন তিনি মাতৃভূমি বা রাজ-আবাস রক্ষার ব্যবস্থা করিলেন না, কিংবা করিলেও কিরুপ ব্যবস্থা করিয়াছিলেন? তিনি বৃদ্ধ হইতে পারেন: কিন্তু তিনি তো দেশের রাজা-বীরধর্ম এবং রাজধর্ম কি তিনি বিস্মৃত হইয়াছিলেন! তিনি তো শত্রু প্রতিরোধে মৃত্যুবরণ করিয়া বীরধর্ম পালন করিতে পারিতেনঅথচ তিনিই এককালে শৌর্যে-বীর্যে, শস্ত্র ও সৈন্যবলে কাশী, কলিঙ্গ ও কামরুপ বিজয় করিয়াছিলেনএমন কি, নবদ্বীপ ত্যাগের পরেও তিনি পূর্ববঙ্গে কয়েক বৎসর রাজত্ব পরিচালনা এবং প্রজার কল্যাণার্থে মহাযজ্ঞের অনুষ্ঠান করিয়াছিলেন তাঁহার মৃত্যুর পরে তাঁহার বংশধরগণ আরও পঞ্চাশ বৎসর পূর্ববঙ্গ অঞ্চলে রাজত্ব করিয়াছিলেন মীনহাজের গ্রন্থে আর একটি কাহিনীর সন্ধান পাওয়া যায়; এই কাহিনীর মধ্যে মহারাজ লক্ষণসেনের মানসিক অবস্থা এবং সমসাময়িক বাঙালি সমাজের মনোবৃত্তির পরিচয় পাওয়া যায় মীনহাজ বর্ণিত কাহিনী বিশ্লেষণ করিলেও মহারাজ লক্ষণসেনের আচরণের ইঙ্গিত পাওয়া যায়

 

মীনহাজ বর্ণিত কাহিনীতে আছে-ইখতিয়ারউদ্দীন যখন বিহার ও মগধ বিজয় ও লুণ্ঠন করিতেছিলেন তখন বঙ্গের অধিপতি ছিলন রায় লখমনিয়া তাঁহার রাজধানী ছিল নবদ্বীপ বা নদীয়া নগরীতে ইখতিয়ারউদ্দীনের বিজয়কাহিনী এবং যশোবার্তা রাষ্ট্রের বিভিন্ন অঞ্চল হইতেই তাঁহার কর্ণগোচর হইয়াছিলএই অবস্থায় তাঁহার রাজ্যের কতিপয় গুণী, পণ্ডিত, জ্যোতিষী এবং পরামর্শদাতা রাজসকাশে উপস্থিত হইয়া নিবেদন করিলেন-প্রাচীন শাস্ত্রে উল্লিখিত আছে যে, এই দেশ বিদেশী তুর্কী জাতি কর্তৃক বিজিত হইবে এবং সেই সময়ও প্রায় সমাগত তুর্কী সৈন্যগণ বিহার জয় করিয়াছে এবং পর বৎসরই তাহারা বঙ্গে আসিবে তাঁহারা রাজাকে আরও অনুরোধ করিলেন-তিনি যেন প্রজাবর্গসহ দেশ পরিত্যাগ করিয়া পূর্ববঙ্গ ও কামরূপে আশ্রয় গ্রহণ করেন; তাহা হইলেই তিনি বিধর্মী তুর্কীর অত্যাচার হইতে নিস্কৃতি পাইবেনরায় লখমনিয়া সেই বিধর্মী বিজেতার দেহাকৃতি সম্বন্ধে কোনো বর্ণনা আছে কি না জিজ্ঞাসা করিলেন তাঁহারা উত্তর দিলেন যে, প্রাচীন গ্রন্থে সেই বিজেতার রূপবর্ণনাও রহিয়াছে-তিনি হইবেন আজানুলম্বিতভুজ রায়ের নির্দেশে উক্তপ্রকার দেহাকৃতিবিশিষ্ট ব্যক্তির অনুসন্ধানে বিশ্বস্ত অনুচর প্রেরিত হইল তাঁহারা রাজধানীতে প্রত্যাবর্তন করিয়া রাজসমীপে নিবেদন করিল যে, মুহম্মদ ইখতিয়ারউদ্দীনই শাস্ত্র-বর্ণিত বিধর্মী বিজেতা; অর্থাৎ ইখতিয়ারউদ্দীনের দেহাকৃতিতেই শাস্ত্রবর্ণিত-বিধর্মী বিজেতার রূপের সাদৃশ্য রহিয়াছেএই বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য জানিবার পরেই রাজ্যের অধিকাংশ ব্রাহ্মণ অধিবাসী পূর্ববঙ্গ ও কামরুপ পলায়ন করিলেনরায় লখমনিয়া কিন্তু স্বদেশ ও স্বরাজ্য ত্যাগের পরামর্শকে স্বচ্ছন্দমনে গ্রহণ করিতে পারিলেন না সুতরাং তিনি নবদ্বীপেই রহিয়া গেলেন শত্রু অগ্রসরমান জানিয়া এবং মন্ত্রী উপদেষ্টাবর্গের পরামর্শে বিচলিত হইলেও লক্ষণসেন রাজধানী পরিত্যাগ করিলেন না কিন্তু ছদ্মবেশী শত্রুর অতর্কিত আক্রমণে পলায়ন ব্যতীত যখন আর কোনো উপায় ছিল না, তখনই তিনি পলায়ন করিয়াছিলেনতিনি ভীরু কাপুরুষ ছিলেন না-ছিলেন ভাগ্যবিড়ন্বিত বঙ্গদেশ ও সমাজ ইতিহাসের অমোঘ নিয়মে যে অনিবার্য পরিণতির দিকে অগ্রসর হইতেছিল, লক্ষণসেনের শৌর্যবীর্য এবং গুণাবলী বাংলাদেশকে সেই আসন্ন পরিণতি হইতে রক্ষা করিতে পারিত না এবং পারেও নাই লক্ষ্মণসেনের ব্যক্তিগত পরাক্রম এবং শৌর্যবীর্যের পরিচয় দিতে গিয়ে মীনহাজ লিখিয়াছেন-রায় লখমনিয়া মহান নরপতি ছিলেন (এৎবধঃ জধর)-হিন্দুস্থানে তাঁহার মত সম্মানিত রাজা আর ছিলেন নাতিনি কাহারও প্রতি অত্যাচার-অবিচার করেন নাই এবং কখনও লক্ষ কড়ির কমে কাহাকেও দান করেন নাই১৬

 

বিদেশী ইখতিয়ারউদ্দীন কর্তৃক নবদ্বীপ বিজয়ের কারণ আরও গভীর, আরও ব্যাপক-তাহা উত্তর ভারতের সমসাময়িক ইতিহাসের সহিত যুক্ত ভারতীয় পদাতিক, গজারোহী এবং স্বল্পমাত্র অশ্বারোহী সৈন্য অপেক্ষা তুর্কীদের দ্রুতগামী সুকৌশলী অশ্বারোহী সৈন্য অপেক্ষা তুর্কীদের দ্রুতগামী সুকৌশল অশ্বারোহী সৈন্য বহুগণে নিপুণ ছিল সুতরাং মুসলিম রণপাণ্ডিত্য, রণকৌশল এবং রণনৈপুণ্যের নিকট ভারতীয় সৈন্যকে পুনঃপুনঃ পরাজয় স্বীকার করিতে হইয়াছে বঙ্গদেশও এই সাধারণ নিয়েমেই যেন বিদেশী তুর্কী বাহিনীর নিকট পরাজিত হইয়াছিল নবদ্বীপে মুসলিম সৈন্যের অতর্কিত আক্রমণ প্রতিরোধ করিবার মত প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব, চিত্তবল কিংবা প্রতিরোধক্ষমতা লক্ষণসেনের সৈন্যদের ছিল না লক্ষণসেন রাষ্ট্র এবং রাজধানী রক্ষার জন্য কতখানি সুব্যবস্থা করিয়াছিলেন, তাহা জানা যায় না; তবে এই প্রতিরোধ-ব্যবস্থা যে খুব সুষ্ঠু ছিল, তাহাও মনে হয় না

 

তরাইনের যুদ্ধের পরই উত্তরভারত ক্রমে ক্রমে মুসলমানের পদানত হইয়া পড়িয়াছিল এবং ১১৯৪ খ্রিষ্টাব্দে গাহড়বাল-রাজ জয়চন্দ্রের মৃত্যুর পর পূর্বদিকে একমাত্র পরাক্রান্ত স্বাধীনরাজ্য ছিল লক্ষ্মণসেনের সেনরাষ্ট্র গাহড়বাল প্রতিরোধ প্রাচীর ভাঙ্গিয়া পড়িবার সঙ্গে সঙ্গেই বিদেশী আক্রমণের সকল আঘাত আসিয়া পড়িল সেনরাষ্ট্রের উপরসেই সেনরাষ্ট্রের কিয়দংশ যখন অধিকৃত হইল, বিহার বিধ্বস্ত ও লুণ্ঠিত হইল, তখন জনসধারণের মন সাধারণ নিয়মেই আতঙ্ক ও ভীতিগ্রস্ত হইয়া উঠিয়াছিলএই আতঙ্কেই বহু লোক পূর্ব-বঙ্গ ও কামরুপে আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছিল-বিশেষত ব্রাহ্মণ ও বণিকগণ; এমন কি, নবদ্বীপও প্রায় জনশূন্য হইয়া পড়িয়াছিলকেবল মীনহাজই একথা বলেন নাই-বৌদ্ধ ভিক্ষু তারানাথাও বলিয়াছেন যে, বহু ব্রাহ্মণ ও বৌদ্ধভিক্ষু সমসাময়িক কালে নানাদিকে আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছিলেন

 

সেনযুগ ব্রাহ্মণ্য ধর্ম ও আচার অনুষ্ঠানের যুগসেন নরপতিগণ ছিলেন ব্রাহ্মণ ধর্ম ও সংস্কৃতির গভীর অনুরাগী সমর্থক-অন্ধ বিশ্বাসী বলিলেও অত্যুক্তি হয় না বৌদ্ধ পালযুগের সমন্বয়ী সমাজ-ব্যবস্থাকে বিচূর্ণ করিয়া নূতন ব্রাহ্মণ্য স্মৃতি অনুযায়ী সমাজ ব্যবস্থা রচনা করাই ছিল তাঁহাদের প্রচেষ্টা ব্রাহ্মণ স্মৃতি অনুযায়ী সমাজ ব্যবস্থা রচনা করাই ছিল তাঁহাদের প্রচেষ্টা ব্রাহ্মণ ব্যতীত অন্য ধর্মাবলম্বীদের কোনো যোগ্য স্থানই রাষ্ট্রে যা রাষ্ট্রব্যবস্থায় ছিল না বৌদ্ধগণ সেনযুগে তো অবজ্ঞাত অবহেলিতই ছিলেন সুতরাং রাষ্ট্রের কিংবা ব্রাহ্মণ ধর্মাবলম্বী সেন নরপতির প্রতি তাঁহাদের বিশেষ কোন সহানুভূতি ছিল না-ছিল সহজাত বিদ্বেষঅতএব বৌদ্ধবিরোধী সেনরাষ্ট্রের বিপদে বৌদ্ধগণ কোন প্রতিরোধের চেষ্টা না করিয়া দূরে সরিয়া যাইবে-ইহাই তো স্বাভাবিক মনোবৃত্তি; যদিও বৌদ্ধগণের স্বদেশের বিরুদ্ধে বিভীষণ বৃত্তি বা বিদেশী মুসলমানকে সহায়তা কোনোমতেই সমর্থনযোগ্য নহে অবশ্য সাধারণ মানুষের পক্ষে সাধারণ মনোবৃত্তির অর্ধ্বে ওঠা যথেষ্ট কঠিন ব্যক্তিগত কারণে কিংবা কয়েকটি বণিকগোষ্ঠীর ধনৈশ্বর্যের জন্য সেন-নরপতিগণ তাঁহাদের প্রতি সন্তুষ্ট ছিলেন না শ্রেষ্ঠী এবং বিত্তশালী বণিকগণও সেন নরপতিদের প্রতি ক্ষুব্ধ হইয়াছিলেন সুতরাং তাঁহারাও সেনরাষ্ট্রের বিপদের মুহূর্তে নির্লিপ্ত রহিলেন ব্রাহ্মণগণ সেনযুগের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পারিপার্শ্বিকতায় অতিমাত্রায় আচারনিষ্ঠ হইয়া উঠিয়াছিলেন অবশ্য এই আচারনিষ্ঠা প্রায় কুসংস্কারেই পরিণত হইয়াছিল সুতরাং ব্রাহ্মণগণও বিদেশী বিধর্মীর অত্যাচার হইতে স্বীয় নিয়মব্যবস্থা ও আচারনিষ্ঠার অন্তরালে আত্মরক্ষার জন্য মুসলমান আক্রমণের পূর্বাহ্নে দেশ ত্যাগ করিলেন

 

ব্রাহ্মণ জ্যোতিষীগণের জ্যোতিষগণনা ও শাস্ত্রের যে যুক্তির ইঙ্গিত মীনহাজের বিবরণে পাওয়া যায়, তাহাও অস্বীকার করা চলে না লক্ষ্মণসেনের জন্মকাহিনী অলৌকিক এবং অবিশ্বাস্য হইলেও উহা সমসাময়িক জনসমাজের জ্যোতিষে বিশ্বাসই প্রমাণ করে মীনহাজারে বিবরণে উল্লিখিত আছে যে, বল্লালমহিষীর (লক্ষ্মণসেনের মাতা) সন্তানসম্ভবনা হইয়াছে; প্রসব সময় প্রায় সমুপস্থিত রাষ্ট্রের জ্যোতিষিবর্গকে শুভক্ষণ নির্ধারণের জন্য আহ্বান করা হইল জ্যোতিষীবর্গ ভবিষ্যদ্বাণী করিলেন যে, একটি নির্দিষ্ট সময় অন্তে সন্তান প্রসূত হইলে সেই সন্তান রাজ্যেশ্বর হইবে রাজমহিষী এই ভবিষ্যদ্বাণী শ্রবণে তাঁহার পরিচারিকাবৃন্দকে আদেশ করিলেন, যেন তাঁহার শির নিম্নমুখী এবং পদদ্বয় উর্ধ্বমুখী করিয়া রাখা হয় তাঁহার আদেশ প্রতিপালিত হইল নির্দিষ্ট সময় অন্তে পরিচারিকাবৃন্দ রাজমহিষীকে যথারীতি প্রসূতি-শয্যায় শায়িত করিল এবং তাঁহার গর্ভোপরি রাজমুকট স্থাপিত হইলএই অবস্থায় রাজা লক্ষ্মণসেনের জন্ম হইল কিন্তু রাজমহিষী বা রাজমাতা এই অস্বাভাবিক প্রসব-ব্যবস্থার অসহ্য যন্ত্রণা সহ্য করিতে না পারিয়া সন্তানের  জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই ইহলীলা সংবরণ করিলেনএই যুগের খ্যাতনামা পণ্ডিত, সমাজের পরিচালক ভবদেব ভট্ট, হলায়ুধ প্রভৃতি সকলেই ছিলেন জ্যোতিষে বিশ্বাসী এবং জ্যোতিষ-নির্ভরএমন কি, সেন নরপতিগণও জ্যোতিষে বিশ্বাসী ছিলেন তাঁহারা জ্যোতিষ শাস্ত্র আলোচনা করিয়াছেন বল্লালসেন এবং লক্ষ্মণসেন জ্যোতিষ গ্রন্থ পর্যন্ত রচনা করিয়াছেনরাজা, রাজপরিবার, মন্ত্রিবর্গ এবং জনসাধারণ, সকলেই যেন জ্যোতিষে বিশ্বাসী ও জ্যোতিষে নির্ভরশীল হইয়া উঠিয়াছিল সুতরাং সেই সংকটময় মুহূর্তে মীনহাজ জ্যোতিষীদের উক্ত আচরণ সম্বন্ধে যাহা বলিয়াছেন, তাহা অস্বীকার করা চলে না জনসাধারণ যেখানে আতঙ্কগ্রস্ত-পলায়নপর, রাষ্ট্রের মন্ত্রী ও উপদেষ্টামণ্ডলী যেখানে পরাজয়ী মনোবৃত্তি দ্বারা আচ্ছন্ন, জ্যোতিষ যেখানে রাষ্ট্রবুদ্ধির নিয়ামক, সেই ক্ষেত্রে সৈন্যদল এবং জনসাধারণের চিত্তবল এবং প্রতিরোধ-বাসনা সুদৃঢ় ও সফল হইতে পারে না সুতরাং লক্ষণসেনও ব্যক্তিগত শৌর্যবীর্য-প্রভাবে এই আসন্ন পতন প্রতিরোধ করিতে পারতেন না লক্ষ্মণসেনের আচরণকে মুসলিম শক্তি কর্তৃক বঙ্গবিজয়ের কারণ বলা চলে না সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় নিম্নগামী প্রবাহকে রোধ করিবার মত সাহস, শক্তি, বুদ্ধি, চরিত্রের দৃঢ়তা, ব্যক্তিত্ব ও বিত্তবৃত্তি যেন কাহারও ছিল না-সকলেই যেন অনিবার্য ভবিষ্যৎকে ভবিতব্য বলিয়াই গ্রহণ করিয়াছিলেন

 

ইখতিয়ারউদ্দীনের গৌড়বিজয়

 

ইখতিয়ারউদ্দীনের নবদ্বীপ-বিজয়ের পশ্চাতে প্রধান উদ্দেশ্য ছিল লুণ্ঠন রাজ্যবিজয় প্রধান লক্ষ্য হইলে তিনি নিশ্চয়ই লক্ষণসেনের পশ্চাদ্ধাবন করিয়া কিংবা তাঁহার বিরুদ্ধে সৈন্য প্রেরণ করিয়া তাঁহাকে পরাজিত করিবার চেষ্টা করিতেন কিন্তু লক্ষ্মণসেনের বিরুদ্ধে সৈন্যপ্রেরণ তিনি যুক্তিযুক্ত বিবেচনা করেন নাই কিংবা সেন্য প্রেরণ করিলেও অনিশ্চিত পরিস্থিতি এবং জয়লাভ অনিশ্চিত বুঝিয়াই পূর্ববঙ্গে অভিযান প্রেরণ করেন নাই লক্ষণসেন পূর্ববঙ্গের বিক্রমপুরে ১২০৬ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত রাজত্ব করেন ইখতিয়ারউদ্দীন স্বল্পকাল মাত্র নবদ্বীপে অবস্থান করিলেন এবং প্রচুর ধনরত্ন লুণ্ঠন করিয়া বঙ্গের রাজধানী গৌড় অভিমুখে অগ্রসর হইলেনগৌড় নগরী নবদ্বীপের মত অরক্ষিত ছিল না; কিন্তু দুর্গপ্রকার-সমন্বিত গৌড় নগরীও মুসলমান সৈন্যের আক্রমণ প্রতিরোধ করিতে পারিল না; গৌড় বিজিত হইল কিন্তু এই গৌড়বিজয় সম্বন্ধে কোনো বিস্তৃতি বিবরণ পাওয়া যায় না হিন্দুগণ এই অপমানের গ্লানি লিপিবদ্ধ করেন নাই মুসলিমগণও এই বিজয়ের সম্বন্ধে সম্পূর্ণ নিরবএই নিরবতা স্বাভাবিককারণ নদীয়াতে রাজ-নিবাস পরিবর্তিত হইবার পর হইতেই গৌড়ের ঐশ্বর্য এবং প্রাধান্য হ্রাস পাইতেছিলবণিক, ধনিক এবং সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ রাজার সঙ্গে সঙ্গে নদীয়াতে বসতি স্থাপন করিয়াছিলেন গৌড়ের সমৃদ্ধি হইল ক্ষয়িষ্ণু তারপর ইখতিয়ারউদ্দীন কর্তৃক নদীয়া বিজয়ের পরেই গৌড়বাসী বুঝিল ইখতিয়ারউদ্দীনের পরবর্তী লক্ষ্য হইবে গৌড় সুতরাং গৌড়বাসীগণ ধর্ম, সম্মান ও সম্পত্তি রক্ষার জন্য কেহ মিথিলায়, কেহ বা নেপালে চলিয়া গেলগৌড় তখন মৃত নগরী গৌড়বিজয় সামরিক গৌরবের বস্তু ছিল না; লুণ্ঠনের দিক হইতেও গৌড়বিজয় সুফলপ্রসূ হয় নাই সুতরাং মুসলিম ইতিহাসকারগণ গৌড়জিয়ের উল্লেখ প্রয়োজনীয় মনে করেন নাই

 

১২০৩ খ্রিস্টাব্দে মুহম্মদ ইখতিয়ারউদ্দীন বরেন্দ্র বা উত্তরবঙ্গ বিজয় সমাপ্ত করিলেন ইখতিয়ারউদ্দীন কর্তৃক গৌড়বিজয়ের সমকালে মালিক কুতুবউদ্দীন আইবক কালিঞ্জয়, মাহোবা ও কলপী বিজয় সুসম্পন্ন করিয়াছিলেন ইখতিয়ারউদ্দীন স্বীয় বাহুবলে ও বুদ্ধিবলে নবদ্বীপ গৌড় বিজয় করিয়াছিলেন কুতুবউদ্দীন তাঁহাকে সৈন্য বা অর্থ দ্বারা বিন্দুমাত্রও সাহায্য করেন নাই কিন্তু পরে ইখতিয়ারউদ্দীনের এই নবদ্বীপ ও গৌড় বিজয় কুতুবউদ্দীনের মনে কোনো ঈর্ষার উদ্রেক করে বা কতুবউদ্দীন ইখতিয়ারউদ্দীনকে বঙ্গ-বিহারের শাসকরূপে স্বীকার না করেন-এই আশংকায় ইখতিয়ারউদ্দীন কুতুবউদ্দীনকে বিংশতি-সংখ্যক হস্তী এবং প্রচুর ধনরত্ন উপহার দিলেন কুতুবউদ্দীনও ইখতিয়ারউদ্দীনকে অশ্ব, তরবারি, নিশান এবং খিলাত প্রদান করিলেন ইখতিয়ারউদ্দীনের উদ্দেশ্য সিদ্ধ হইল কুতুবউদ্দীন আত্মতৃপ্তি লাভ করিলেন যে, ইখতিয়ারউদ্দীন তাঁহার বশ্যতা স্বীকার করিয়াছেন এবং ইখতিয়ারউদ্দীন আত্মগৌরব অনুভব করিলেন যে, তিনিই হইলেন বঙ্গের স্বাধীন শাসক ও অধিকর্তা

 

ইখতিয়ারউদ্দীনের শাসন-ব্যবস্থা

 

পরবর্তী দুই বৎসর কাল (১২০৩-১২০৫ খ্রিঃ) ইখতিয়ারউদ্দীন তাঁহার নববিজিত রাজ্যখণ্ডে শান্তি ও শৃঙ্খলা বিধানে মনোনিবেশ করিলেনতিনি শাসন-ব্যবস্থা প্রবর্তনে ইসলামের চিরাচরিত শাসনরীতিই অনুসরণ করিলেন বিজিত ভুখণ্ড তিনি তাঁহার সহকর্মী তুর্কী খালজী আমীরগণের মধ্যে বন্টন করিয়া দিলেন তুর্কীরীতি অনুসারে কোন আমীরই অন্য আমীর অপেক্ষা নিম্নস্তরের নহেনএই সামন্তরীতিই তুর্ক-আফগান শাসনব্যবস্থার প্রাণকেন্দ্রএই ব্যবস্থা অনুযায়ী মালিক বা আমীরগণ তাঁহাদের সীমার মধ্যে স্বাধীনভাবেই শাসন-ব্যবস্থা পরিচালনা করিতেন অবশ্য লুণ্ঠন, পৌত্তলিকবিগ্রহ ও মন্দির ধ্বংস, মসজিদ নির্মাণ, কাফের বা বিধর্মীকে ধর্মান্তরিতকরণ এবং মুসলিম ধর্ম প্রচারের জন্য মাদ্রাসা স্থাপন পত্যেক মুসলমানের পক্ষেই পুণ্যকর্ম বলিয়া বিবেচিত হইত রাজ্যরক্ষার জন্য মুহম্মদ ইখতিয়ারউদ্দীন অধিকৃত অঞ্চলের বিভিন্ন প্রান্তে কয়েকটি দুর্গ নির্মাণ করিলেন

 

ইখতিয়ারউদ্দীনের রাজ্যসীমা

 

ইখতিয়ারউদ্দীনের রাজ্যের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে ছিল লাখনোর (বর্তমান বীরভূম জিলার অন্তর্গত নগর বা রাজনগর) এবং উত্তর-পূর্ব কোণে ছিল দেবকোট (বর্তমান দিনাজপুরের অন্তর্গত গঙ্গারামপুর।) বর্তমান বীরভূম, নদীয়া, মুর্শিদাবাদ, মালদহ ও দিনাজপুর জেলা তাঁহার রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল অর্থাৎ প্রাচীন রাঢ় ও বরেন্দ্র ব্যাপিয়া মুহম্মদ ইখতিয়ারউদ্দীনের রাজ্যে বিস্তৃত ছিল

 

তিব্বত অভিযান

 

তিব্বত অভিযানই ছিল মুহম্মদ ইখতিয়ারউদ্দীনের জীবনের শেষ কর্মপ্রচেষ্টা বা শেষ সমরাভিযান মুহম্মদ ইখতিয়ারউদ্দীন ছিলেন জাত সৈনিক, যুদ্ধই ছিল তাঁহার জীবনের প্রেরণা, শক্তির মূল উৎস সুতরাং নিরস গতানুগতিক শাসনকার্য লইয়া তিনি সন্তুষ্ট থাকিতে পারিলেন না শাসন-ব্যবস্থা রচনা তাঁহাকে অধিক দিন আনন্দ দিতে পারিল না তাঁহার অনুচর তুর্কী ও আফগান সৈনিকগণও যুদ্ধের অভাবে চঞ্চল হইয়া উঠিয়াছিল সুতরাং তাহাদিগকেও কর্মের সন্ধান দিতে হইবে, লুণ্ঠনের উপযুক্ত ক্ষেত্রের সন্ধান দিতে হইবে হিমালয়ের অপরাংশের দেশখণ্ড তাঁহার দৃষ্টি আকর্ষণ করিল পূর্বেই এই অঞ্চলের ধনৈশ্বর্যের কাহিনী তাঁহার শ্রুতিগোচর হইয়াছিল দুঃসাহসিক কর্মের উন্মাদনা, নূতন দেশ জয়ের মোহ, তিব্বতের মধ্য দিয়া হিন্দুস্থান ও তুর্কীস্থানের মধ্যে যোগসূত্র-স্থাপন, তিব্বতীয় অশ্বক্রয়ের একাধিকার লাভ এবং ইসলাম প্রচারের আবেগও তাঁহাকে এই তিব্বতাভিযানে উদ্বুদ্ধ করিয়াছিল তিব্বতের মন্দিরে দুই-তিন হাজার মণ ওজনের স্বর্ণমূর্তির কাহিনীও তাঁহাকে প্রলুব্ধ করিয়াছিল

 

তিব্বত বাঙালির নিকট অপরিচিত ছিল না সুপ্রাচীন কাল হইতেই তিব্বতের সহিত বঙ্গের যোগসূত্র ছিল এবং বঙ্গ ও তিব্বতের এই বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ কখনও ছিন্ন হয় নাইঅতি প্রাচীনকাল হইতেই বৌদ্ধধর্ম প্রচারসূত্রে তিব্বতের সহিত বঙ্গের একটা আত্মীয়তা এবং ঘনিষ্ঠতাও গড়িয়া উঠিয়াছিল বাংলার কীর্তিমান সন্তান মতিধ্বজ তিব্বতের প্রধান লামার পদে অধিষ্ঠিত হইয়াছিলেন বঙ্গের গৌরবরবি, ভারতের জ্ঞানসূর্য দীপঙ্কর অতীশ শ্রীজ্ঞান তিব্বতে ভগবান তথাগত বুদ্ধের বাণী প্রচার করিয়া তিব্বতেই দেহত্যাগ করেন দুর্গম গিরিপথ অতিক্রম করিয়া বাঙালিসন্তান তিব্বতের পথে চীনের সহিত যোগসূত্র রক্ষা করিয়াছিল ভুটান ও তিব্বতের বণিকগণ উত্তরবঙ্গ ও কামরুপের বিপণিতে পণ্যসম্ভার বিক্রয় করিতে আসিত এবং তাহারা অদ্যাপি আসে ইখতিয়ারউদ্দীন তিব্বতীয় বণিকদের নিকট হইতে তিব্বতের ধনৈশ্বর্যের কাহিনী শ্রবণ করিয়াছিলেন এবং অন্যান্য তথ্যও সংগ্রহ করিয়াছিলেন মীনহাজ-উস-সিরাজও তিব্বত এবং তুর্কীস্থান সম্বন্ধে বহু সংবাদ সংগ্রহ করিয়াছিলেন

 

মুহম্মদ ইখতিয়ারউদ্দীনের তিব্বত অভিযানের পশ্চাতে আরও উদ্দেশ্য ছিল তাঁহার নববিজিত রাজ্যের পূর্ব সীমান্তে তিস্তা ও করতোয়া নদীর অপর তীরেই ছিল শক্তিশালী কামরুপ রাজ্য পশ্চিমে গণ্ডক ও কুশীনদীর মধ্যবর্তী অঞ্চলে ছিল পরাক্রমশালী মিথিলা রাজ্য দক্ষিণ-পশ্চিমে ছিল পরাক্রান্ত গঙ্গবংশীয় রাজগণের উড়িষ্যা রাজ্য এবং পূর্ববঙ্গে বিক্রমপুর অঞ্চলে মহারাজ লক্ষ্মণসেন তখনও রাজত্ব করিতেছিলেন সুতরাং ইখতিয়ারউদ্দীনের পক্ষে এই সকল হিন্দুরাজ্য বিজয়ই ছিল সমীচীন কিন্তু অনিশ্চিত জয়ের আশায় তিনি এই সকল পরাক্রান্ত রাজ্য আক্রমণ করিয়া স্বীয় ভাগ্যকে ক্ষুন্ন করিতে ইচ্ছুক ছিলেন না, অথচ তাঁহার এবং তাঁহার সৈন্যদলের সমরলিপ্সা পরিতৃপ্ত করারও প্রয়োজন ছিল সুতরাং তিনি বরেন্দ্র ও হিমালয়ের মধ্যবর্তী অজ্ঞাত বিজয়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিলেনএই অঞ্চলের অপর পার্শ্বে ছিল তিব্বত, চীন ও তুর্কীস্থানের বিস্তৃত ভুখণ্ড সুতরাং তিনি সমতল অংশের সুসভ্য হিন্দুরাজ্যে অভিযান না করিয়া অজ্ঞাত অঞ্চল বিজয়েই অগ্রসর হইলেন

 

মুহম্মদ ইখতিয়ারউদ্দীনের তিব্বত অভিযান অনিশ্চিতের পথে অভিযান নহে তিব্বত অভিযানে অগ্রসর হইবার পূর্বেই তিনি যথেষ্ট বিচক্ষণতার সহিত সমস্ত সামরিক আয়োজন এবং যোগাযোগের সুষ্ঠ ব্যবস্থা করিয়াছিলেনসেই সময়ে লক্ষ্মণাবর্তী এবং হিমালয়ের মধ্যবর্তী পার্বত্য অরণ্যময় অঞ্চলে কোন, মেচ, থারু প্রভৃতি কয়েকটি মোঙ্গলীয় জাতি বাস করিত তবকাৎ-ই-নাসিরী গ্রন্থ হইতে জানা যায় যে, তিব্বত অভিযানের পূর্বেই তিনি এই পার্বত্য অঞ্চলের তথ্য সংগ্রহের জন্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অভিযাত্রী বা অগ্রগামী দল প্রেরণ করিয়াছিলেন অভিযাত্রী দল কর্তৃক একজন মেচ-নায়ক ধৃত হইয়াছিলেন মেচ-নায়ক ধর্মান্তর গ্রহণ করিয়া জীবন রক্ষা করিলেন তাঁহার নূতন নামকরণ হইল আলী মেচ তাঁহার বহু মেচ-অনুচরও ইখতিয়ারউদ্দীনের সহিত যোগদান করিল; অবশ্য তাহারা সকলেই যে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করিয়াছিল তাহা নহে কামরূপ আক্রমণ ও বিজয়ের চেষ্টা করিয়াছিলেন সুতরাং ইখতিয়ারউদ্দীনের ধারণা হইয়াছিল যে, লক্ষণসেনের প্রতি বিরূপতাবশত হয় তো কামরুপরাজ তাঁহার সহায়তা করিবেন ইখতিয়ারউদ্দীনের সহিত কামরূপরাজ যোগদান করিয়াছিলেন বলিয়া কোনো প্রমাণ নাই কিন্তু মুহম্মদ ইখতিয়ারউদ্দীনের দুর্ধর্ষ বিজয়ী সেনাদলকে বাধা দিবার সাহসও তাঁহারা ছিল না সুতরাং ইখতিয়ারউদ্দীন কামরূপের পথেই তিব্বত অভিযানের পরিকল্পা করিলেন

 

সুদূর তিব্বত অভিযানে যাত্রা করিবার পূর্বেই মুহম্মদ ইখতিয়ারউদ্দীন তাঁহার রাজ্য রক্ষার সুব্যবস্থাও করিলেনতিনি মুহম্মদ শিরাণ ও আহম্মদ শিরাণ নামকা ভ্রাতৃদ্বয়কে লাখনোরে (বর্তমান বীরভূমের অন্তর্গত নগর বা রাজনগর) এবং জাজ নগরে (উত্তর উড়িষ্যা) প্রেরণ করিলেন গঙ্গার তীরবর্তী হিন্দুগণকে ব্যস্ত ও বিব্রত রাখা এবং রাঢ় অঞ্চল স্থায়ীভাবে বিজয়ই ছিল শিরাণ ভ্রাতৃদ্বয়ের উপর ন্যস্ত কর্তব্যভার রাজ্যের পূর্বসীমান্ত রক্ষার জন্য আলী মরদান খালজী সরকার ঘোড়াঘাটে নিযুক্ত হইলেন-তাঁহার কর্মকেন্দ্র হইল করতোয়াতীরস্থ বরসাউল বা বড়সালা রাজ্যের পশ্চিম সীমান্ত রক্ষার ভারপ্রাপ্ত হইলেন হুসামউদ্দীন খালজ তাঁহার কর্মকেন্দ্র ছিল সরকার তানডা বা রাজমহলের অন্তর্গত গাঙ্গুরীতিনি রাজমহল হইতে কুশী পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলের শাসনভার লাভ করিয়াছিলেনএই কুশী নদী মিথিলারাজ্য এবং লক্ষ্মণাবতী বা গৌড়রাজ্যের সীমা নির্দেশ করিত

 

১২০৬ খ্রিষ্টাব্দে শীতের শেষে মুহম্মদ ইখতিয়ারউদ্দীন তিব্বত অভিমুখে যাত্রা করিলেন ইখতিয়ারউদ্দীনের সৈন্য সমাবেশ হইয়াছিল দেবকোটে-বর্তমান দিনাজপুর শহরের দশ মাইল দক্ষিণে প্রায় দশ সহস্র অশ্বারোহী সৈন্য সংগৃহীত হইল-ইহাই তবকাৎ-ই-নাসিরী গ্রন্থের রচয়িতা মীনহাজ-উস-সিরাজের অভিমত অবশ্য গোলাম হুসেন মীনহাজ-উদ্দীন,১৯ নিজামউদ্দীন,২০ বদায়ুনী২১ প্রভৃতি ইতিহাসকারগণের মতে এই সৈন্যসংখ্যা ছিল দ্বাদশ সহস্র দেবকোট হইতে ইখতিয়ারউদ্দীনের বিপুল বাহিনী উত্তর পূর্ব দিকে অগ্রসর হইল, পথ-প্রদর্শক ছিলেন আলী মেচ; আপাতত গন্তব্যবস্থান ছিল বর্ধনকোট২২ পথ দুর্গম, খাদ্য-ব্যবস্থা বিঘ্নবহুল, শত্রুর শক্তি অজ্ঞাত, ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত বিজয়ের পর বিজয় ইখতিয়ারউদ্দীনকে দুঃসাহসী করিয়া তুলিয়াছিল কিন্তু তিনি কল্পনাও করিতে পারেন নাই যে, এই অভিযানই তাঁহার জীবনের শেষ সমরাভিযান

 

দেবকোট হইতে উত্তর-পূর্বাভিমুখে যাত্রা করিয়া আলী মেচের নেতৃত্বে মুসলিম সেনাবাহিনী অবশেষে বর্ধনকোট নগরে আসিয়া উপস্থিত হইল বর্ধনকোটের সম্মুখে গঙ্গার তিন-চারিগুণ প্রশস্ত একটি নদী প্রবাহিত তবকাৎ-ই নাসিরী এবং তবকাৎ-ই-আকবরী গ্রন্থে এই নদী বাগমতী নামে উল্লিখিত রিয়াজ-উস-সালাতীন অনুসারে এই নদীর নাম নমকদি বদায়ুনী এই নদীকে ব্রক্ষণপুত্র বা ব্রক্ষপুত্র বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন ফেরিস্তা অনুসারে এই নদীর নাম তিমকরিএই নদীর অবস্থিতি সম্পর্কে মীনহাজ,২৩ নিজামউদ্দীন,২৪ গোলাম হুসেন,২৫ দায়ুনী,২৬ ফেরিস্তার,২৭ মধ্যে মতভেদ আছে কাহারো মতে ইহা ব্রহ্মপুত্র, মতান্তরে ইহা তিস্তা বা ত্রিস্রোতাতবে বর্ধনকোট এখন বগুড়া জেলায় (প্রাচীন মহাস্থানগড়ের সংলগ্ন ভূমিখণ্ড) বিদ্যমান রহিয়াছে এবং বর্ধনকোটের সম্মুখে করতোয়া ব্যতীত অপর কোনো বৃহৎ নদী নাই ব্লকম্যান-এর মত অনুসারে প্রাচীন তিস্তা নদীরই নাম বাগমতী২৮

 

দেবকোট (বর্তমান দিনাজপুরের দশ মাইল দক্ষিণে) হইতে মুসলিম বাহিনী উত্তর-পূর্বাভিমুখে অগ্রসর হইয়াছিল বর্ধনকোট যদি প্রাচীন পুণ্ড্রবর্ধন বা মহাস্থানগড়ের সন্নিকটে হয়, তাহা হইলে মুসলিম সেনাবাহিনীকে বিপরীত মুখে অর্থাৎ দক্ষিণ-পূর্বে আসিতে হইয়াছিল এবং করতোয়া ভিন্ন কোন বৃহৎ নদীও এই অঞ্চলে নাই মুসলিম বাহিনী দেবকোট হইতে উত্তর-পূর্ব মুখে অগ্রসর হইয়া বাগমতী তীরে বর্ধনকোটে পৌঁছিয়াছিল মুসলিম সেনাবাহিনী উত্তর-পূর্ব মুখে অগ্রসর হইয়াছিল, সুতরাং বর্ধনকোট দেবকোটের উত্তর-পূর্বে অবস্থিত ছিল ব্লকম্যান মীনহাজোক্ত বাগমতীকে তিস্তা নদীর সহিত অভিন্ন বলিয়াছেন এবং মনে হয় তাঁহার অনুমানই সত্য; কারণ, বর্ধনকোট  করতোয়া তীরে অবস্থিত হইলে কামরূপের পথে অগ্রসর হইতে অপর একটি নদী অতিক্রম করিতে হয় এবং এই নদীই তিস্তা পূর্বেই উক্ত হইয়াছে যে, কখনও কখনও কামরূপ রাজ্যের সীমা ব্রহ্মপুত্র করতোয়া নদী অতিক্রম করিয়া রংপুর, কুচবিহার, জলপাইগুড়ি জেলার সীমানা-এমন কি, কুশী নদীও স্পর্শ করিয়াছিল মীনহাজের বিবরণ পাঠে অনুমিত হয় যে, বর্ধনকোট ছিল দেবকোট হইতে উত্তর পূর্বে অবস্থিত তিস্তা নদীর তীরে একটি সমৃদ্ধ নগরী

 

বর্ধনকোট হইতে নদীর তীর অনুসরণ করিয়া নদীর উৎসমুখে দশদিন অবিশ্রান্ত চলিবার পর একাদশ দিবসে ইখতিয়ারউদ্দীনের সেনাবাহিনী পর্বতের সানুদেশে সমুপস্থিত হইল ইখতিয়ারউদ্দীন এইখানে বিংশতি খিলানযুক্ত একটি প্রাচীন পাষাণনির্মিত সেতু দেখিতে পাইলেনসেই সেতুপথে মুসলিম সৈন্যবাহিনী সহজেই সুপ্রশস্ত্র খরস্রোতা নদী অতিক্রম করিল গৌহাটির নিকটে ব্রক্ষণপুত্রতীরস্থ কানাইবরশী বোয়া নামক স্থানের শিলালিপি পাঠে জানা যায় যে, মুহম্মদ  ইখতিয়ারউদ্দীন কামরূপের মধ্য দিয়া একটি ব্যর্থ অভিযান পরিচালনা করিয়াছিলেনএই শিলালিপিটির নিকটেই একটি সেতুও বিদ্যমান সম্ভবত এইটিই মীনহাজ-বর্ণিত বিংশতি-খিলানযুক্ত পাষাণসেতুএই শিলালিপিটির পাঠ নিম্নরূপ:

 

শাকে ১১২৭ (১২০৬, ২৭ মার্চ আনুমানিক)

শাকে তুরগ যুগ্মেশে মধুমাসে ত্রয়োদশে

কামরূপং সমাগত্য তুরস্কাঃ ক্ষয়মায়য়ুঃ

(কামরূপ-শাসনাবলী ভূমিকা)

 

আলী মেচ এই স্থান হইতেই বিদায় গ্রহণ করিলেন ইখতিয়ারউদ্দীন তাঁহার দুইজন আমীরকে সেতুরক্ষায় নিযুক্ত করিয়া পার্বত্য পথে আরোহণ আরম্ভ করিলেন এইবার তাঁহারা বঙ্গের সীমানা অতিক্রম করিলেন এবং কামরুপের উত্তরতম অঞ্চল অনুসরণ করিয়া অগ্রসর হইলেন কামরূপরাজ ইখতিয়ারউদ্দীনকে তাঁহার রাজ্য মধ্য দিয়া সৈন্য পরিচালনায় বাধাপ্রদান করেন নাইতিনি বর্ষার শেষে তিব্বতে অভিযান করিতে পরামর্শ দিয়াছিলেন এবং স্বয়ং সসৈন্যে ইখতিয়ারউদ্দীনের সহিত যোগদান করিবেন-এইরূপ আশ্বাসও প্রদান করিয়াছিলেন কিন্তু ইখতিয়ারউদ্দীন কামরূপরাজের পরামর্শে কর্ণপাত করিলেন নাতিনি তখন জয়ের নেশায় উন্তত্ত-কিংবা ভবিতব্য তাঁহাকে অনিবার্য পরিণতির দিকে আকর্ষণ করিতেছিল

 

পঞ্চদশ দিবস ক্রমাগত চলিবার পর বিপদসংকুল দুর্গম পার্বত্য পথ শেষ হইলষোড়শ দিবসে মুসলিম সৈন্যগণ দেখিল সম্মুখে বিশাল উপত্যকা, সুকর্ষিত জনবহুল ভূখণ্ড অপরিচিত বিদেশীয় দর্শনমাত্রই তিব্বতীয়গণ আক্রমণকারীদিগের বিরুদ্ধে যুদ্ধ আরম্ভ করিল সূর্যোদয় হইতে সূর্যাস্ত পর্যন্ত যুদ্ধ চলিল মুসলিম বাহিনীকে বিপুল ক্ষতি স্বীকার করিতে হইলএই যুদ্ধের স্থান সম্বন্ধে সুনিশ্চিত জানা যায় নাতবে এই স্থানটি তিব্বতের কেন্দ্রস্থলে না হইলেও তিব্বত রাজ্যের অন্তর্গত সীমান্তবর্তী কোন স্থানে, তাহা নিঃসন্দেহকারণ, এই স্থান হইতে পঁচিশ ক্রোশ বা পঞ্চাশ মাইল দূরেই তিব্বতের বিখ্যাত শহর করমবর্তন (করবর্তন বা করপত্তন)এই স্থানে প্রায় পঞ্চাশ সহস্র তিব্বতী সৈন্য ছিলএই করমবর্তনের বিপণিতে প্রতিদিন দেড় সহস্র টাঙ্গন অশ্ব (টাটু ঘোড়া) বিক্রীত হইত লক্ষ্মণাবতীতে আনীত সকল অশ্বই ঐ করমবর্তনের বিপণিতে ক্রীত এবং তিব্বত-কামরুপের মধ্যবর্তী পার্বত্য অঞ্চলে প্রায় পঁয়ত্রিশটি গিরিবর্ত্ম রহিয়াছে কিন্তু তথাপি করমবর্তনের অবস্থান নির্দেশ করা সুকঠিনআবার কাহারও মতে করমবর্তনের অশ্ববিক্রয়-কেন্দ্র দিনাজপুর জেলার অন্তর্বতী নেকদুমার বাজারএখনও ঐ বাজারে বহু অশ্ব বিক্রীত হয়এই সকল অশ্বের অধিকাংশই তিব্বত ও ভুটানের টাঙ্গন অশ্ব কিন্তু করমবর্তন দিনাজপুরের অন্তর্বর্তী না হওয়াই স্বাভাবিক; কারণ, মুহম্মদ ইখতিয়ারউদ্দীন দেবকোট হইতে ষড়বিংশতি দিবসের পথ অতিক্রম করিয়াই তিব্বতের প্রান্তরে উপস্থিত হইয়াছিলেন ইখতিয়ারউদ্দীন প্রথম সৈন্য সমাবেশ করিয়াছিলেন বর্তমান দিনাজপুরের দশমাইল দক্ষিণস্থ দেবকোটে দেবকোট হইতে মুসলিম সৈন্যবাহিনী প্রথম দশদিনের বর্ধনকোটে এবং তথা হইতে ষোড়শ দিবস পরে তিব্বতে উপস্থিত হয় সুতরাং দিনাজপুরের কোনো অঞ্চলই গৌড়, দেবকোট কিংবা বর্ধনকোট হইতে ছাব্বিশ দিনের পথ হইতে পারে না-দশ সহস্র সৈন্যসহ পদব্রজে চলিলেও নহে

 

মুহম্মদ ইখতিয়ারউদ্দীন যুদ্ধে জয়ী হইলেও সুদূর অপরিচিত পার্বত্য-অঞ্চলে যুদ্ধের অভিজ্ঞতা তাঁহার পক্ষে খুব প্রীতিপ্রদ হয় নাই সুতরাং সেই রাত্রিতেই তিনি শিবির উত্তোলন করিলেন এবং সৈন্যগণকে প্রত্যাবর্তনের আদেশ প্রদান করিলেন প্রত্যাবর্তনের পথে মুহম্মদ ইখতিয়ারউদ্দীন জীবনের তিক্ততম অভিজ্ঞতা লাভ করিলেন সৈন্যদের খাদ্য নাই, অশ্বের তৃণ নাই; কারণ, তাহাদের প্রত্যাবর্তনের পূর্বেই পার্বত্য সৈন্যগণ সমস্ত খাদ্য ও শস্য বিনষ্ট করিয়া দিয়াছিল সৈন্যগণ অবিশ্রান্ত পথশ্রমে শ্রান্ত ক্লান্ত, পশ্চাৎভাগ শত্রুসৈন্য কর্তৃক আক্রান্ত, জীবন বিপন্ন খাদ্যাভাবে অশ্বারোহী সৈনিকগণ তাঁহাদের জীবনের শ্রেষ্ঠ বন্ধু অশ্বগুলিকে হত্যা করিয়া ক্ষুণ্নিবৃত্তি নিবারণ করিতে বাধ্য হইল; অনেকে খাদ্যাভাবে প্রাণত্যাগ করিল; কেহ বা অতিরিক্ত পথশ্রম এবং পরিশ্রম সহ্য করিতে না পারিয়া মৃত্যুবরণ করিল পরিশেষে পঞ্চদশ দিবসের পথ অতিক্রম করিয়া তাহারা বাগমতীর তীরে উপস্থিত হইল

 

কিন্তু ভাগ্যদেবী বিমুখ হইয়াছেন মুহম্মদ ইখতিয়ারউদ্দীন সেতুর নিকট উপস্থিত হইয়া দেখিলেন সেতু ভগ্ন-অনতিক্রমনীয়; পশ্চাতে নিস্করণ শত্রু, সম্মুখে খরস্রোতা বাগমতীযে দুইজন আমীরকে তিনি সেতুরক্ষায় নিযুক্ত করিয়াছিলেন, তাঁহারা পরস্পর বিবাদের ফলে সেতু পরিত্যাগ করিয়াছেনদী অতিক্রমের কোনো উপায় নাই দেখিয়া মুহম্মদ ইখতিয়ারউদ্দীন নৌকা সংগ্রহের চেষ্টা করিলেন কিন্তু একটিও নৌকা সংগৃহীত হইল না ইখতিয়ারউদ্দীন সসৈন্য নিকটবর্তী একটি উচ্চ দেবমন্দিরে আশ্রয় গ্রহণ করিয়া নৌকা ও ভেলা নির্মাণের চেষ্টা করিলেন

 

কামরূপরাজ মুসলিম সৈন্যের ভাগ্যবিপর্যয় ও দুর্দশার কাহিনী শ্রবণ করিয়া তাহাদিগকে অবরোধ করিবার জন্য সৈন্য প্রেরণ করিলেন কামরুপ-সৈন্যগণ সেই দেবমন্দিরের তচুর্দিকে অসংখ্য বংশখণ্ড দ্বারা অবরোধ প্রাচীর রচনা করিল মুসলিম সৈন্যগণ যখন দেখিল যে, তাহাদের প্রত্যাবর্তনের পথ ক্রমেই রুদ্ধ হইয়া আসিতেছে, তখন অন্যন্যোপায় হইয়া তাহারা অবরোধ-প্রাচীরের একাংশ ভেদ করিয়া অশ্বপৃষ্ঠেই নদী অতিক্রম করিতে প্রয়াস পাইল ইখতিয়ারউদ্দীনের দশ সহস্র সৈন্যের মধ্যে মাত্র একশত জন অশ্বারোহী ব্যতীত সমস্ত সৈন্য নদীজলে নিমজ্জিত হইলনদীর অপর তীরে আলী মেচের আত্মীয়স্বজন অপেক্ষা করিতেছিলেন তাঁহাদের সহায়তায় ইখতিয়ারউদ্দীন তাঁহার একশত অশ্বারোহীসহ বহুকষ্টে দেবকোটে প্রত্যাবর্তন করিলেনইহাই মীনহাজ-বর্ণিত ইখতিয়ারউদ্দীনের তিব্বত-অভিযানের কাহিনী

 

মীনহাজ-বর্ণিত এই তিব্বত-অভিযান কাহিনীর সত্যতা সম্বন্ধে ইতিহাসকার রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয় তাঁহার বাঙ্গলার ইতিহাস গ্রন্থে সন্দেহ প্রকাশ করিয়াছেন তাঁহার অভিমত-তবকাৎ-ই-নাসিরীর অন্যান্য অংশের তুলনায় তিব্বত-অভিযানের কাহিনী অনেকটা অষ্পষ্ট, কল্পনা-প্রসূত; ইহাতে অনেক অলীক কাহিনীর সমাবেশ আছে মীনহাজের গ্রন্থে বর্ণিত আছে, শাহ গুষতাস্প চীন হইতে প্রত্যাবর্তনের পথে কামরুপে আসিয়াছিলেন নদীতীরে দেবমন্দিরে দুই-তিন সহস্র মণ ওজনের সুবর্ণপ্রতিমার কথাও আছেএই সকল কারণে অনুমতি হয় যে, মগধ ও গৌড় বিজয় করিয়া গর্বান্ধ ইখতিয়ারউদ্দীন হিমালয়ের পাদদেশস্থিত কোন পার্বত্য জাতি কর্তৃক পরাজিত হইয়াছিলেনসেই পরাজয়ের সংবাদ গোপন করিবার জন্য যে-সমস্ত অলীক কাহিনীর অবতারণা করিতে হইয়াছিল, মৌলানা মীনহাজ-উস-সিরাজ তাহাই লিপিবদ্ধ করিয়া গিয়াছেন২৯ কিন্তু মীনহাজ যদি তাঁহার এত বৃহৎ গ্রন্থের কোথাও সত্যের অপলাপ না করিয়া থাকেন, তাহা হইলে এক্ষেত্রেই বা করিবেন কেন? পরাজয়ের অপমান গোপন করিতে হইলে তিব্বত-অভিযানে মুহম্মদ ইখতিয়ারউদ্দীনের চরম বিপর্যয় এবং ব্যর্থতার কাহিনীও গোপন করিতে পারিতেন ইখতিয়ারউদ্দীনের ব্যর্থতা এবং বিপর্যয়ের কাহিনী বর্ণনা করিতে তো মীনহাজ কুণ্ঠিত হন নাইতবে কোনো কোনো বিষয়ে অতিরঞ্জন থাকিতে পারে কিন্তু অতিরঞ্জনের পশ্চাতেও সত্য ন্যূনাধিক পরিমাণে নিহিত থাকে

 

আবার কেহ কেহ অনুমান করেন যে, আসামের শিলহাকো নামক স্থানে যে সেতু আছে, মুহম্মদ ইখতিয়ারউদ্দীন সেই সেতু অতিক্রম করিয়া তিব্বতে গমন করিয়াছিলেন কিন্তু উহা অসম্ভব; কারণ, শিলহাকো প্রাচীন কামরূপদেশের উত্তর পশ্চিম ভাবে অবস্থিত এবং কামরুপ বিজিত না হইলে শিলহাকো অতিক্রম করা অসম্ভব৩০ পূর্বেই উল্লিখিত হইয়াছে যে, ইখতিয়ারউদ্দীনের বিজয়কাহিনী ও বীর্যবত্তায় ভীত হইয়াই স্বীয় স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য কামরূপরাজ, ইচ্ছায় হউক, অনিচ্ছায় হউক, মুসলিম সৈন্যকে তাঁহার রাজ্য মধ্য দিয়া অভিযানের অনুমতি প্রদান করিয়াছিলেনএমন কি, পর বৎসর অভিযান করিলে তিনি সসৈন্যে যোগদান করিবেন-এমন উক্তিও করিয়াছিলেন সুতরাং কামরূপ রাজ্যমধ্যস্থ সেতু অতিক্রম করিতে কামরূপ বিজয়ের কোনো প্রশ্ন ওঠে না অবশ্য কামরূপরাজের পরামর্শ গ্রহণ না করায় তাঁহার আত্মাভিমানে আঘাত লাগিয়াছিল এবং সেই জন্য সেই আহত আত্মাভিমানের ক্ষুব্ধ রোষেই তিনি প্রত্যাবর্তনের পথে মুসলিম সৈন্যের বিপর্যয় ও দুর্দশার কাহিনী শ্রবণ করিয়া তাহাদের অবরোধ করিবার জন্য সৈন্য প্রেরণ করিয়াছিলেন ইখতিয়ারউদ্দীনের শ্রান্ত-ক্লান্ত হতোদ্যম ভগ্নপ্রায় সৈনাবাহিনী হইতে তখন তাঁহার ভীত ও আতঙ্কিত হইবার কোনো কারণ ছিল না তদ্ব্যতীত কামরূপের হিন্দু নরপতির পক্ষে বিপর্যস্ত বিধ্বস্ত বিদেশী বিধর্মী অভিযাত্রী দলের বিরুদ্ধে সংগ্রামও বিচিত্র নহে

 

তিব্বত-অভিযানই ইখতিয়ারউদ্দীনের জীবনের শেষ সমরাভিযান দেবকোট হইতে প্রত্যাবর্তন করিয়াই তিনি অসুস্থ হইয়া পড়িলেন পরাজয়ের ক্ষোভ ও অপমানে ইখতিয়ারউদ্দীন সমাজ ও বন্ধুবান্ধবের সঙ্গ পরিহার করিয়া চলিতে লাগিলেনকারণ, তিব্বত-অভিযানে নিহত সেনানীবর্গের আত্মীয়-পরিজন তাঁহাকে দেখিলেই অভিসম্পাত বর্ষন করিত, শ্লেষ করিত ইখতিয়ারউদ্দীন শ্লেষ সহ্য করিতে পারিতেন নাতিনি গৃহপ্রাচীরের অন্তরালেই থাকিতে চেষ্টা করিতেনফলে অভিযানের বিফলতায় এবং নেতার অদর্শনে তুর্কী ও খালজী সেনাবাহিনী বিদ্রোহী হইয়া উঠিল যুদ্ধ ও লুণ্ঠন যাহাদের জীবিকা, পরাজয় ও ব্যর্থতাকে তাহারা স্বচ্ছন্দ মনে গ্রহণ করিতে পারে না এবং সেনাপতির উপর বিশ্বাস বিনষ্ট হইলে অক্লেশেই তাঁহাকে পারিত্যাগ করে-কোনো দ্বিধাই তাহাদের মনে জাগে না অত্যল্পকালের মধ্যেই ইখতিয়ারউদ্দীনের সৈন্যদলের মধ্যেও বিরোধ এবং বিশ্বাসঘাতকতা দেখা দিল দুভার্গ্যবশত মুহম্মদ ইখতিয়ারউদ্দীনও এই সময়ে আসামের কালাজ্বর রোগে আক্রান্ত হইয়া পড়িলেন রোগশয্যায় তাঁহার সুদিনের বন্ধু আলী মরদান খালজী বন্ধুদর্শনের প্রচ্ছন্ন উদ্দেশ্যে আগমন করিলেন এবং রুগ্ন ও পীড়িত বন্ধুর বক্ষে ছুরিকা বিদ্ধ করিয়া বন্ধুকে অপমানের হস্ত হইতে নিস্কৃতি প্রদান করিলেন (আগস্ট, ১২০৬ খ্রিঃ)

 

তিব্বত-অভিযানের আপাত ফল হইল এই যে, বঙ্গদেশে মুসলিম অগ্রগতির প্রবাহ প্রতিহত হইল; শক্তিশালি মুসলিম সেনাবাহিনী নূতন করিয়া গঠিত হইতে পারিল না; খালজী সৈনিকগণ উপযুক্ত নেতা-বিহনে বিচ্ছিন্ন হইয়া পড়িল ইখতিয়ারউদ্দীনের মৃত্যুর পর তাহার বিজিত ভূখণ্ড সৈন্যাধ্যক্ষগণ নিজেদের মধ্যে ভাগ করিয়া লইলেনএই সৈন্যাধ্যক্ষ বা আমীরগণের মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য আলী মরদান, হুসামউদ্দীন আইয়াজ এবং মুহম্মদ শিরাণ খালজী তাঁহাদের পরস্পর বিরোধে পরবর্তী কয়েক বৎসর বাংলার জন-জীবন দুর্বহ হইয়া উঠিয়াছিল

 

মুহম্মদ ইখতিয়ারউদ্দীনের কৃতিত্ব

 

মধ্যযুগের তুর্ক-আফগান ও মোঙ্গলজাতির সকল দোষগুণ লইয়াই মুহম্মদ ইখতিয়ারউদ্দীন জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেনতখনও এই পার্বত্য অর্ধসভ্য জাতিগুলো স্থায়িভাবে কোনো উপনিবেশ গঠন করে নাই কিংবা স্থায়িভাবে বসবাসও আরম্ভ করে নাই তাহারা ছিল ভ্রাম্যমাণ যাযাবর; আহার এবং আশ্রয়ের সন্ধানে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দলে বিভক্ত হইয়া তাহারা দেশ-দেশান্তরে ভ্রমণ করিত বর্ধিষ্ণু নগর-জনপদ তাহারা দ্বিধাহীন চিত্তে লুণ্ঠন করিতঅনেক সময় যুদ্ধ ও ধ্বংসের উন্মাদনায় তাহারা দূর-দূরান্তে বক্‌সী বলিয়াছেন-মুহম্মদ ইখতিয়ারউদ্দীন মস্তকে রাজচ্ছত্র ধারণ করিতেন; তাঁহার নামে মুদ্রাঙ্কন হইয়াছিল এবং খুত্‌বা পাঠও হইত৩২ সম্ভবত ইখতিয়ারউদ্দীন সুলতান পদবী গ্রহণ করেন নাই সুলতান উপাধি গ্রহণ না করিলেও সুলতানোচিত সমস্ত অধিকার ও ক্ষমতা উপভোগ করিয়াছেন-তাহাতে কোন সন্দেহ নাই

 

রাজ্যজয় এবং পূর্ববর্তী যুগের মোঙ্গল আক্রমণকারীদের ন্যায় ধনসম্পদ লুণ্ঠন করিয়াই ইখতিয়ারউদ্দীন নিশ্চন্ত হন নাই বিজিত রাজ্যে যুযোপযোগী সামন্ততান্ত্রিক শাসন-ব্যবস্থা প্রবর্তনের চেষ্টাও তিনি করিয়াছিলেন বিজিত ভূখণ্ড তিনি তাঁহার সহকর্মী মালিকদের মধ্যে বণ্টন করিয়া দিয়াছিলেন এবং সীমান্তের অধিকতর বিস্তৃত এবং গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে সর্বক্ষমতাসম্পন্ন সর্বাধিনায়ক নিযুক্ত করিয়াছিলেনএই শাসন ব্যবস্থারই অন্য নাম মালিককানা শাসন এইটিই মুসলিম শাসন-ব্যবস্থার বিশেষত্বএই ব্যবস্থানুসারে মালিক উপাধিধারী সেন্যাধ্যক্ষদের উপরে নির্দিষ্ট অঞ্চলের শাসনভার ন্যস্ত হইত এবং তাঁহারা স্বীয় শাসিত অঞ্চলে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবেই শাসন-ব্যবস্থা পরিচালনা করিতে পারিতেন ইখতিয়ারউদ্দীন মালিকদিগকে বিভিন্ন অঞ্চলের শাসনভার অর্পণ করিয়া গৃহ বিবাদ নিরসনের চেষ্টা করিয়াছিলেন তাঁহার অনুপস্থিতিতেও কোন বিদ্রোহ হয় নাই-ইহা তাঁহার শাসনের দৃঢ়ভিত্তিরই পরিচায়ক মূগলযুগের পূর্ব পর্যন্ত বঙ্গদেশে ইখতিয়ারউদ্দীন প্রবর্তিত শাসন-ব্যবস্থাই বলবৎ ছিলএই ব্যবস্থারই রূপান্তরে বার ভূঁইঞার অভ্যুদয় হয় সুতরাং ইখতিয়ারউদ্দীন কেবল সুনিপুণ যোদ্ধা এবং সুকৌশলী সেনানায়কই ছিলেন না, শাসন-প্রতিভাও তাঁহার ছিল প্রত্যক্ষভাবে ইসলাম প্রচারকে উদ্দেশ্য বা আদর্শ বলিয়া গ্রহণ না করিলেও মুসলমানের অবশ্য কর্তব্য বিধর্মীকে ধর্মান্তরিতকরণে তিনি নিশ্চেষ্ট ছিলেন না মেচরাজা আলী মেচ নাম গ্রহণ করিয়া ধর্মান্তরের প্রমাণ দিয়াছেন হিন্দুমন্দির এবং বৌদ্ধমঠ বিধ্বস্ত করিতেও তিনি কুণ্ঠিত হন নাই স্বীয় ধর্ম এবং সংস্কৃতি বিস্তারের উদ্দেশ্যে তিনি কয়েকটি মসজিদ ও মাদ্রাসা স্থাপন করিয়াছিলেন

 

মুহম্মদ ইখতিয়ারউদ্দীন গৌড় নগরীতে রাজধানী স্থাপন করেন দেবকোট নগরীর পত্তন না করিলেও তিনি পুরাতন নগরীর বহু সংস্কার ও উন্নতি সাধন করিয়াছিলেন তাঁহার কর্মকেন্দ্র ছিল দেবকোট দেবকোট হইতেই তিনি তিব্বত অভিযানে যাত্রা করিয়াছিলেন মুহম্মদ ইখতিয়ারউদ্দীন হিন্দুনগরী দেবকোটের নিকট দমদমাতে একটি দুর্গ বা সেনানিবাস স্থাপন করিয়াছিলেন মুহম্মদ ইখতিয়ারউদ্দীনের প্রতিষ্ঠিত অন্য একটি নগরকে কেন্দ্র করিয়াই পরবর্তীকালের রঙ্গপুর নগর গড়িয়া উঠিয়াছিল

 

ইখতিয়ারউদ্দীন ছিলেন দুর্ধষ যোদ্ধা, অফুরন্ত আশাবাদী এবং অদম্য উৎসাহী জীবনে বিফলতার নিকট তিনি পরাজয় স্বীকার করেন নাই ভাগ্যান্বেষণে সিন্তান হইতে তিব্বত পর্যন্ত বিশাল ভূখন্ড তিনি অশ্বপৃষ্ঠে পরিভ্রমণ করিয়াছেন বিন্ধ্যগিরির সানুদেশ হইতে বঙ্গের শেষপ্রান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল তাঁহার কর্মক্ষেত্র ১৯৯৫-১২০৬ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত একাদশ বৎসরে তিনি বিন্ধ্যাঞ্চলের ঘন বনানী, তরঙ্গসংকুল গঙ্গা, খরস্রোতা বাগমতী এবং হিমালয়ের তুষারবৃত গিরিপথ দুর্বারবেগে অতিক্রম করিয়াছেনকোন বিপদ-বাধাই তাঁহাকে সংকল্পচ্যুত করিতে পারে নাই স্বার্থসিদ্ধির জন্য তিনি বিশ্বাসঘাতকতা করিতেও কুণ্ঠিত হন নাই ইখতিয়ারউদ্দীনের জীবনের ঘটনাপঞ্জী আলোচনা করিলে তাঁহাকে হঠকারী বলিয়াই মনে হয় তিব্বত অভিযানে এই উদ্ধত হঠকারিতাই তাঁহার সর্বনাশের কারণ হইয়াছিলকারণ, তিনি কামরুপরাজের পরামর্শ গ্রহণযোগ্য বলিয়াই মনে করেন নাই কিন্তু বঙ্গবিজেতারূপে মুহম্মদ ইখতিয়ারউদ্দীন ইসলামের ইতিহাসের পৃষ্ঠায় স্মরণীয় হইয়া আছেন এবং চিরকাল অবিস্মরণীয়ই থাকিবেন

 

 

  q ইখতিয়ারউদ্দীনের অভিযান পথ (মানচিত্র)

 

 

 

পাদটীকা:

 

১.  Tabqat-i-Nasiri, Tr. By Raverty, p.550. F.N.S.   Back to main text

 

২.  ibid. Text, p.147   Back to main text

 

৩.  Muntakhab-ut-Tuwarikh, Text, p,57   Back to main text

 

৪.  Riyaz-us-salatin, Text, p.61  

(for details, see Gazetteer of the Mirzapur District, 1911)   Back to main text

 

৫.  Epigraphica Indica, XXII, p.22   Back to main text

 

৬.  Tabqat-i-Nasiri, Tr. By Raverty, p.550   Back to main text

 

৭.  This year, i.e. 1200 AD he was busy in consolidating his hold over the province, as the author of Riaz-us-Salatin says, "by establishing thanas and military outposts and by introducing administrative arrangements".   Back to main text

 

৮.  History of Bengal, Dacca University, Vol, II, p.3   Back to main text

 

৯.  History of Bengal, Dacca University, Vol, II, p.6   Back to main text

 

১০.  Tabqat-i-Nasiri, Tr. By Raverty, pp.541-543   Back to main text

 

১১.  Tabqat-i-Nasiri, Tr. by Raverty, p.557   Back to main text

 

১২.  Ibid, p.558   Back to main text

 

১৩.  Tabqat-i-Nasiri, Tr. by Raverty, p.557   Back to main text

 

১৪.  হুগলী-হাওড়ার ইতিহাস, বিধুভূষণ ভট্টাচার্য্য, ১ম খণ্ড, ২৮৪-২৮৬ পৃ: ।   Back to main text

 

১৫.  Tabqat-i-Nasiri, Tr. by Raverty, p.556   Back to main text

 

১৬.  Tabqat-i-Nasiri, Tr. by Raverty, p.558 F.N.7   Back to main text

 

১৭.  Tabqat-i-Nasiri, Tr. P. 560   Back to main text

 

১৮.  Riyaz-us-Salatin, Tr. p.64   Back to main text

 

১৯.  Tabqat-i-Akbari, Tr. P.52   Back to main text

 

২০.  Tarikh-i-Hindustan, Tr. p.294   Back to main text

 

২১.  Muntakhab-ut-tawarikh, Tr. P.83   Back to main text

 

২২.  Bardahankot identified with Pundrabardhan by Minhaj in his Tabqat-i-Nasiri, says Ramaprasad Chanda (Sahitya Parishad Patrika, 1320 B.S., p.312)   Back to main text

 

২৩.  Tabqat-i-Nasiri, Tr.. p.561   Back to main text

 

২৪.  Tabqat-i-Akbari, Tr. P.52   Back to main text

 

২৫.  Riyaz-us-Salatin, Tr. p.65   Back to main text

 

২৬.  Muntakhab-ut-tawarikh, Tr. P.84   Back to main text

 

২৭.  Tarikh-i-Ferishta, Tr. P.294   Back to main text

 

২৮.  Sahitya Parishad Patrika, 1320 B.S., p. 311-312   Back to main text

 

২৯.  বাঙ্গালার ইতিহাস, রাখালদাস বন্দোপাধ্যায়, ২য় খণ্ড, ৩২ পৃ: ।   Back to main text

 

৩০.  বাঙ্গালার ইতিহাস, রাখালদাস বন্দোপাধ্যায়, ২য় খণ্ড, ৩২ পৃ: ।   Back to main text

 

৩১.  JASB. Old Series, Vol XX, p.291   Back to main text

 

৩২.  Tabqat-i-Nasiri, Tr. by Raverty, p.559 N.3   Back to main text