হুসেনশাহী বংশের অধীনে বঙ্গদেশ

(নসরৎ শাহ পর্যন্ত)

(৮৯৬/১৪৯৩-৯৩৫/১৫৩২ খ্রিঃ)

 

 

 

সূচনা

 

এই বংশের সুলতান চারিজন - আলাউদ্দীন হুসেন শাহ, নসরৎ শাহ হুসেনী, আলাউদ্দীন হুসেনী এবং গিয়াসউদ্দীন মামুদ হুসেনী ইহাদের শাসনকালের দৈর্ঘ পঁয়তাল্লিশ বৎসর (৮৯/১৪৯৩-৯৫/১৫৩খ্রিঃ)-গড়ে সাড়ে এগার বৎসর ইহারা ছিলেন জাতিতে আরব, ধর্মে মুসলমান, সংস্কৃতিতে বাঙালিএই হুসেনশাহী বংশের সময়কালে বাংলাদেশে বৈষ্ণবধর্মের প্রচার ও প্রসার হইয়াছিল বাংলাভাষা বিশিষ্টরূপ পরিগ্রহ করিয়া জনসাধারণের নিকট ধর্মের নূতন আবেদন সঞ্চারিত করিয়াছিলএই যুগের বঙ্গের নবজাগরণ ইউরোপীয় রেনেসাঁর সঙ্গে ন্যূনাধিক তুলনীয় হুসেনশাহী সুলতানগণ ছিলেন যুদ্ধে কুশল এবং শাসনে সাধারণত প্রজার কল্যাণকামী হুসেনশাহী সুলতানগণের সুশাসনে দেশে-শান্তি ও শৃঙ্খলা স্থাপিত হইয়াছিল বলিয়াই বাঙালি প্রতিভার বহুমুখী বিকাশ সম্ভবপর হইয়াছিল রাজ্যজয়ের দিক দিয়াও হুসেনশাহী বংশ কৃতিত্ব ও গৌরবে সমুজ্জ্বলএই সময়ে বঙ্গের রাজ্যসীমা পূর্বে হাজো, শ্রীহট্ট, চট্টগ্রাম এবং পশ্চিমেও বিহার শরিফ স্পর্শ করিয়াছিল

 

আলাউদ্দীন হুসেন শাহ (৮৯৯/১৪৯৩-৯২৫/১৫১৯ খ্রিঃ)

 

হাবসী সুলতান মুজাফর শাহের হত্যার সঙ্গে বাংলার ইতিহাসের একটি দুর্যোগময় অধ্যায়ের অবসান হইল হাবসী রাজত্বের বিশৃঙ্খলায় বঙ্গের সর্বপ্রকার অগ্রগতির স্রোত রূদ্ধ হইয়া গিয়াছিল সিংহাসনের জন্য দ্বন্দ্ব, ষড়যন্ত্র, হত্যা এবং প্রজাসাধারণের উপর নির্মম অত্যাচার - এই যেন ছিল হাবসী রাজত্বের ধারা; সুতরাং রাষ্ট্রের এই শোচনীয় অবস্থায় প্রয়োজন ছিল একজন যোগ্য বিচক্ষণ কর্ণধারের আবির্ভাব - যিনি কঠোরহস্তে সকল বিশৃঙ্খলার অবসান করিবেন; দেশে শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করিবেন এবং লোকের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করিবেন বঙ্গের ভাগ্যক্রমে আরব দেশীয় আলাউদ্দীন হুসেন শরীফ মক্কী হইলেন এই দুর্গত বিপর্যস্ত বঙ্গের ত্রাণকর্তা হাবসী শাসনের বিশৃঙ্খলায় বিক্ষুব্ধ হইয়াই তিনি বিরোধীদলে যোগদান করিলেন এবং মুজাফর শাহকে পরাজিত করিয়া বঙ্গের সিংহাসনে আরোহণ করিলেন (৮৯৯/১৪৯৩ খ্রিঃ) বঙ্গে হাবসী শাসনের বিভীষিকা বিদূরিত হইল

 

হুসেন শাহের বংশ পরিচয় সম্বন্ধে নানা প্রকার ঐতিহাসিক ও অনৈতিহাসিক কিংবদন্তির উল্লেখ আছে হুসেন শাহের উল্লেখ পাওয়া যায় পর্তুগীজ জো-আও-দ্য ব্যারসের (Joao de-Baros) দা এশিয়া (Da Asia) নামক গন্থে, ফেরিস্তার তারিখ-ই-হিন্দুস্তানে, গুরুদাস সরকার সংগৃহীত কিংবদন্তিতে এবং কৃষ্ণদাস কবিরাজের চৈতন্যচরিতামৃত গ্রন্থে

 

 

***                 ***                   ***

 

আলাউদ্দীন হুসেন শাহের রাজত্বের ঘটনাবলী

 

আলাউদ্দীন হুসেন শাহের ছাব্বিশ বৎসর রাজত্বকাল ঘটনাবহুল ও কর্মময় ছিল তাঁহার কার্যাবলী তাঁহার যোগ্যতারই পরিচায়ক তাঁহার রাজত্বের ঘটনাবলীর মধ্যে নিম্নলিখিতগুলিই প্রধান:

 

১.     হাবসী অত্যাচার নিরোধ

২.    একডালায় রাজধানী পরিবর্তন

৩.    দিল্লির সুলতানের সহিত সন্ধি

৪.    রাজ্যবিস্তার - (ক) উত্তর বিহার বিজয় (খ) আসাম অভিযান (গ) উড়িষ্যার যুদ্ধ (ঘ) ত্রিপুরা আক্রমণ (ঙ) আরাকানরাজের সহিত যুদ্ধ

 

বিগত হাবসী রাজত্বে হুসেন শাহ অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করিয়াছিলেন হাবসী গোষ্ঠী দেশে যে অরাজকতার সৃষ্টি করিয়াছিল তাহা হুসেন শাহের অজ্ঞাত ছিল না হাবসী গোষ্ঠী সিংহাসনলাভের ব্যাপারে তাঁহাকে যথেষ্ট সহায়তা করিয়াছিল তাহাদের ধারণা ছিল যে, নূতন সুলতান তাহাদের অত্যাচার-অনাচারের প্রতিবাদ করিবেন না সুতরাং সুলতান হুসেনের রাজ্যলাভের পরেই হাবসীগণ রাজধানী লুণ্ঠন করিতে আরম্ভ করিল

 

কথিত আছে যে, গৌড় নগরীর সেনানায়ক, অমাত্য ও নাগরিকগণের সঞ্চিত অর্থ তাহাদিগকে প্রদান করা হইবে এই শর্তেই নাকি হাবসীগণ হুসেন শাহকে সাহায্য করিয়াছিল সুলতান হুসেন শাহ হাবসীগণকে এই লুণ্ঠনকার্য বন্ধ করিতে আদেশ দিলেন কিন্তু হাবসীগণ তাঁহার আদেশ অমান্য করিলসুলতান বুঝিতে পারিলেন যে কেবলমাত্র আদেশ প্রচার করিয়া হাবসীদিগকে নিরস্ত করা যাইবে না সুতরাং সুলতান হুসেন শাহ হাবসীদিগকে হত্যার আদেশ দিলেন দ্বাদশ সহস্র হাবসী নিহত হইলএকশত নব্বই বৎসর পূর্বে আলাউদ্দীন খালজীও নৃশংসভাবে নওমুসলিম হত্যা করিয়া রাজ্য নিরাপদ করিয়াছিলেন

 

তারপর আসিল প্রাসাদরক্ষীদের সমস্যা তাহারাই ছিল বিগত কয়েক বৎসর যাবৎ (বিশেষত ফতে শাহের হত্যার পর হইতে রাজপ্রাসাদের সকল ষড়যন্ত্রের জন্য মূলত দায়ী সুতরাং হুসেন শাহ নির্বিচারে সমস্ত প্রাসাদরক্ষীদের নির্বাসিত করিলেন এবং তাহাদের স্থলে সম্ভ্রান্ত হিন্দু ও মুসলিমগণকে নিযুক্ত করিলেন

 

কিন্তু কর্মচারী পরিবর্তন দ্বারা তাঁহার উদ্দেশ্য সফল হইল নাকারণ, রাজধানীর চতুস্পার্শ্বে এই সকল প্রবেশ করিয়াছিল এবং হত্যা ও ষড়যন্ত্রের বিষবাস্প রাজধানীর আকাশ-বাতাসকে কলুষিত করিয়া তুলিয়াছিল সুতরাং তিনি রাজধানী হইতে দূরবর্তী স্থানে রাজ্যের কর্মকেন্দ্র স্থাপনের প্রয়াস পাইলেন দিনাজপুর জেলার (বর্তমান পাণ্ডুয়া হইতে তেইশ মাইল উত্তর-পূর্বে) একডালায় তিনি নূতন রাজধানী স্থাপন করিলেনতিনি একডালার আঠার মাইল উত্তরে ছোটপুরা নামক স্থানে নূতন রাজপ্রাসাদ নির্মাণ করিয়া বাস করিতে আরম্ভ করিলেনমুঘল বিজয়ের পূর্বে বারংবার রাজধানী পরিবতনের কারণ সম্ভবত গৌড়ের নিকটবর্তী নদীস্রোতের গতি পরিবর্তন গৌড়নগরীর পূর্বপার্শ্বেই ছিল ছুটিয়াপুটিয়া নামক জলাভূমি জলপ্লাবনে প্রতি বৎসরই গৌড়নগরীর পূর্বপার্শ্বেই ছিল ছুটিয়াপুটিয়া নামক জলাভূমি জলপ্লাবনে প্রতি বৎসরই গৌড় নগরীর বিপুল ক্ষতি সাধিত হইতনগর রক্ষার্থে ছুটিয়াপুটিয়ার এই পার্শ্বে বাঁধ বাঁধিবার বহু চেষ্টা করা হইয়াছিল - অবশেষে বরবক শাহের রাজত্বকালে পীর ইসমাইল গাজী ছুটিয়াপুটিয়ার উপরে সেতু নির্মাণ করিয়া খ্যাতি অর্জন করেন হুসেন শাহ সিংহাসনে আরোহণ করিয়াই পুরাতন অস্বাস্থ্যকর রাজধানী পরিত্যাগ করিলেন

 

রাজ্যে শান্তি ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার জন্য হুসেন শাহের অবলম্বিত ব্যবস্থার বিশদ বিবরণ জানা যায় নাতবে তিনি প্রতি জেলায় অভিজ্ঞ রাজকর্মচারী নিযুক্ত করিয়াছিলেন তাঁহাদিগকে রাজ্যের অশান্তি ও বিশৃঙ্খলা দূর করিবার জন্য যথেষ্ট ক্ষমতা দেওয়া হইয়াছিল রাজ্যের কল্যাণই ছিল হুসেন শাহেলক্ষ্য - সুতরাং উপযুক্ত কর্মচারী নিয়োগে তিনি ধর্মকে খুব উচ্চ স্থান দেন নাই বর্ধমান নিবাসী পুরন্দর বসু (খান), যশোহর নিবাসী রূপ ও সনাতন, তাঁহাদের ভ্রাতা অনুপ এবং সনাতনের শ্যালক উচ্চ রাজকার্যে নিযুক্ত হইয়াছিলেন হিন্দুদিগকে মুসলমানী নাম ও উপাধি প্রধান করা হইয়াছিল-পুরন্দর বসু ছিলেন পুরন্দর খান সনাতন হইলেন দবীর-ই-খাস (private Secretary) বা ব্যক্তিগত কার্যকরণরূপ হইলেন রাজস্ব সচিব (সাকর মল্লিক) এবং অনুপ হইলেন মুদ্রাশালার অধ্যক্ষ (মুদীর-ই-জরব)

 

রাজ্যে শৃঙ্খলা বিধান করিতে-না-করিতেই হুসেন শাহকে অপ্রত্যাশিত সমস্যার সম্মুখীন হইতে হইল বহুকাল হইতেই বঙ্গ ও দিল্লির সম্বন্ধে ছিন্ন হইয়াছিল দিল্লি ও বঙ্গরাজ্যের মধ্যে অবস্থিত জৌনপুর রাজ্য যেন দিল্লির বঙ্গ অভিযানের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ-প্রাচীরস্বরূপ ছিল দিল্লির লোদী সুলতান সিকান্দর জৌনপুরের শার্কী সুলতান হোসেনকে যুদ্ধে পরাজিত করিলে হোসেন সাহ শার্কী বিহার সীমান্তে পলায়ন করিলেন সিকান্দর লোদী তাঁহার পশ্চাদ্ধাবন করিয়া বিহারে উপস্থিত হইলে হোসেন শার্কী ভাগলপুরের অন্তর্গত কহলগাঁয়ে পলায়ন করিলেন এবং বঙ্গের সুলতান আলাউদ্দীন হুসেন শাহের আশ্রয় প্রার্থনা করিলেন

 

হোসেন শাহ শার্কীর পরাজয়ে দিল্লির লোদী বংশের রাজ্যসীমা বিহার পর্যন্ত বিস্তৃত হইল - অর্থাৎ বঙ্গের সীমান্ত স্পর্শ করিল বঙ্গের কোন সুলতানই বোধ হয় এই সীমানা বিস্তারে সন্তুষ্ট ও নিশ্চেষ্ট থাকিতে পারতেন না - হুসেন শাহও দিল্লির এই রাজ্যবিস্তারকে স্বচ্ছন্দমনে গ্রহণ করিতে পারিলেন না দিল্লি ও বঙ্গের মধ্যবর্তী রাজ্য বিধ্বস্ত হওয়ায় দিল্লি ও বাংলার সমস্যাগুলি প্রকট হইয়া উঠিল রাজনৈতিক দিক দিয়া এবং রাজ্যের নিরাপত্তা বিবেচনা করিয়া বাংলার পক্ষে স্বাধীন, শক্তিশালী ও দিল্লির প্রতিদ্বন্দ্বী জৌনপুর রাজ্যের অস্তিত্ব অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ছিল সুতরাং হুসেন শাহ জৌনপুরের বিতাড়িত সুলতানকে আশ্রয় দান ও তাঁহার ভরণপোষণের ব্যবস্থা করিলেন হুসেন শাহের উদ্দেশ্য ছিল জৌনপুর হইবে দিল্লি ও বঙ্গদেশের মধ্যে ব্যবধান-প্রাচীর (Buffer State)

 

 

সিকান্দর লোদী ইহাতে অত্যন্ত ক্রুদ্ধ ও ক্ষুব্ধ হইলেন এবং বঙ্গদেশ আক্রমণের সিদ্ধান্ত করিলেন সিকান্দরের সৈন্য বাংলার সীমান্তে বারহ (বর্তমান পাটনা জেলার পূর্বাঞ্চল) নামক স্থানে শিবির সংস্থাপন করনে সুলতান হুসেন শাহ তাঁহার পুত্র দানিয়েলের অধীনে এক বিরাট সেনাবাহিনী প্রেরণ করিলেন (৯০১/১৪৯৫ খ্রিঃ) সুলতান সিকান্দর লোদীর সেনাপতি মুহম্মদ লোদী ও মুবারক খান লোহানীর বিরাট বাহিনী বাঙালি সৈন্যবাহিনীর উপস্থিতিতে আতঙ্কিত বোধ করিল তাঁহাদের বহুদূরাগত পথশ্রান্ত রণক্লান্ত সৈন্যদ্বারা হুসেন শাহের সেনাবাহিনীকে পরাজিত করিতে পারিবেন কিনা তাহাতে সন্দেহের অবকাশ ছিল একমাত্র গিয়াসউদ্দীন বলবন ব্যতীত দিল্লির কোন সুলতান বাংলার সৈন্যকে সম্মুখ যুদ্ধে সম্পূর্ণ পরাজিত করিতে পারেন নাই সুতরাং বুদ্ধিমান সিকান্দর লোদীর পরামর্শে সন্ধির প্রস্তাব করা হইল অচিরে সন্ধিপত্র স্বাক্ষরিত হইল পিতার পক্ষে দানিয়েল প্রতিশ্রুতি দিলেন যে, দিল্লির সম্রাট সিকান্দর লোদীর শত্রুকে বাংলাদেশে আশ্রয় প্রদান করা হইবে না বাংলা এবং দিল্লির সীমান্তরেখা নির্ধারিত হইল মুঙ্গের ও বিহার শরিফে প্রাপ্ত শিলালিপি হইতে অনুমিত হয় যে, এই সময়ে বাংলার সীমান্ত দক্ষিণ-বিহারে পাটনার প্রান্তদেশ স্পর্শ করিয়াছিল সারণে প্রাপ্ত শিলালিপি হইতে জানা যায় যে, ইহার অনতিকালমধ্যেই হুসেন শাহের রাজ্যসীমা গণ্ডকের তীর পর্যন্ত বিস্তৃত হইয়াছিল কিন্তু এই রাজ্যবিস্তৃতি সিকান্দর লোদীর সহিত সন্ধির ফলে হইয়াছিল কিংব স্বতন্ত্র সামরিক অভিযানের ফলে হইয়াছিল তাহা সঠিক জানা যায় না সিকান্দর লোদী আজম হুমায়ুনকে তুঘলকপুরের এবং দরিয়া খানকে বিহারের ইক্‌তাদার বা শাসনকর্তা নিযুক্ত করিলেন সিকান্দর লোদীর সেনাবাহিনী বঙ্গদেশ আক্রমণ না করিয়া দিল্লিতে প্রত্যাবর্তন করিল-হুসেন শার্কীও ভাগলপুরের অদূরে কহলগাঁয়েই তাঁহার জীবনের শেষ দিনগুলি অতিবাহিত করিলেন-সন্ধির শর্তে হুসেন শার্কীর কহলগাঁয়ের বসতিতে প্রতিবন্ধক সৃষ্টি হয় নাই

 

কামরুপ বিজয় ও আসাম অভিযান

 

সিকান্দর লোদীর সহিত সন্ধি স্থাপিত হইলে হুসেন শাহ তাঁহার রাজ্যের পশ্চিমসীমান্ত সম্বন্ধে নিশ্চিন্ত হইলেন এইবার হুসেন শাহ তাঁহার রাজ্যের উত্তর-পূর্ব সীমান্তের প্রতি মনোনিবেশ করিলেন অহমিয়া ভাষায় লিখিত বুরুঞ্জী অনুসারে ১৪৯৮ খ্রিস্টাব্দে কামতাপুর বিজিত হইয়াছিল এবং ১৫৩২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত মুসলমানগণ বহুবার আহোম রাজ্য আক্রমণ করিয়াছিল শিহাবউদ্দীন তালিশ রচিত তারিখ-ই-ফতে-ই-আসাম, বুরুঞ্জী, শিলালিপি, মুদ্রা, কিংবন্তি ও পরবর্তী ইতিহাসকারগণের রচনার মধ্যে মুসলিম কর্তৃক আসাম অভিযানের কাহিনীর উল্লেখ আছে

 

উত্তরবঙ্গ হইতে আসামের সহিত যোগাযোগ স্থাপন অত্যন্ত সহজ ছিলএই যুগে বাংলার শাসনকেন্দ্র ছিল গৌড়, পাণ্ডুয়া, একডালা প্রভৃতি স্থান গৌড়-একডালা হইতে উত্তর-পূর্বাঞ্চল অতিক্রম করিয়া আসামের প্রান্তদেশ স্পর্শ করা সহজ ছিল কিছুকাল পূর্বে বরবক শাহের রাজত্বকালে কামতাপুরের সহিত বঙ্গের সংঘর্ষ হইয়াছিল যুদ্ধের ফলাফল সঠিক জানা না গেলেও এই সংঘর্ষের ফলে করতোয়া নদীর পূর্ব তীরবর্তী বিস্তৃত অঞ্চল মুসলমানগণের হস্তচ্যুত হইয়াছিল কামতাপুরের খান বংশীয় তৃতীয় নরপতি নীলাম্বর তাঁহার রাজ্যকে সুসংবদ্ধ করিতে চেষ্টা করিলেন পূর্বে বড় নদী পর্যন্ত তাঁহার রাজ্যসীমা বিস্তৃত ছিলতিনি তাঁহার রাজ্যসীমান্ত সুদৃঢ় করিবার জন্য রাজধানী কামতাপুর হইতে করতোয়া তীরস্থ সীমান্ত দুর্গ গোড়াঘাট পর্যন্ত একটি সামরিক পথ নির্মাণ করিলেন বুকানন হ্যামিল্টন দিনাজপুর ভ্রমণকালে এই পথের চিহ্ন দেখিয়াছিলেন

 

বিগত কয়েক বৎসরের অরাজকতা ও অনিশ্চয়তার জন্য বঙ্গদেশের সীমান্তবর্তী স্বাধীন ও সামন্ত রাজগণ নিজেদের রাজ্যে সৈন্যসংখ্যা বৃদ্ধি করিয়াছিলেন তাহারা প্রায়ই মুসলিম অধিকৃত অঞ্চল আক্রমণ করিয়া বিব্রত করিত হুসেন এই বিষয়ে যথেষ্ট সচেতন ছিলেন সুতরাং সিকান্দর লোদীর সহিত সন্ধি স্থাপিত হইলে তিনি আসাম-তথা কামতাপুর রাজ্য আক্রমণের ব্যবস্থা করিলেনএই ব্যাপারে হুসেন শাহ কামতাপুরাধিপতি নীলাম্বরের ব্রাহ্মণ মন্ত্রীর সহায়তা লাভ করিয়াছিলেনকথিত আছে, ব্রাহ্মণ মন্ত্রীর পুত্র রাজান্তঃপুরের শুচিতা নষ্ট করিয়াছিলেন; সুতরাং রাজা নীলাম্বর মন্ত্রিপুত্রকে হত্যা করিলেন সম্ভবত পিতাও এই বিষয়ে অপরাধী পুত্রকে সমর্থন করিয়াছিলেন-এই অপরাধে রাজা নীলাম্বর মন্ত্রিপুত্রকে হত্যা করিয়া মন্ত্রীকে পুত্রের মাংস ভক্ষণ করিতে বাধ্য করিয়াছিলেন মন্ত্রী ব্রাহ্মণ-রাজা নীলাম্বর ব্রহ্মহত্যার পাপ করিলেনতার উপর পিতাকে পুত্রের মাংস ভক্ষণ করিতে বাধ্য করা নিষ্ঠুর নৃশংসতার কাজ ক্রুদ্ধ ক্ষুব্ধ মন্ত্রী প্রতিশোধ গ্রহণের সিদ্ধান্ত করিলেন এবং সুযোগের প্রতীক্ষায় রহিলেন মন্ত্রী পাপস্খলনের জন্য গঙ্গাস্নানের ছলে গৌড়ে আগমণ করিয়া হুসেন শাহের আশ্রয় প্রার্থনা করিলেন হুসেন শাহ কামতাপুরের মন্ত্রীকে আশ্রয় প্রদান করিলেন এবং তাঁহারই পরামর্শক্রমে কামতাপুর আক্রমণের সিদ্ধান্ত করিলেন

 

হুসেন শাহ কামতাপুর-মন্ত্রীর নিকট হইতে রাজ্যের পথ-ঘাট, যানবাহন, সৈন্য, দুর্গ প্রভৃতি সম্বন্ধে সকল তথ্য অবগত হইয়া কামতাপুর আক্রমণ করেন কিংবদন্তি অনুসারে ইসমাইল গাজী ছিলেন এই অভিযানের নায়কতিনি তখন সুদৃঢ় ও সুরক্ষিত রাজধানী কামতাপুর অবরোধ করিলেন কিংবদন্তি আছে যে, ইসমাইল গাজী (?) দ্বাদশ বৎসরকাল রাজধানী অবরোধ করিয়া ছিলেন এবং বাঙালি সৈন্য অবশেষে কৌশলে দুর্গে প্রবেশ করিয়াছিল দীর্ঘদিন অবরোধের পরও বিশেষ কোন সুবিধা করিতে না পারিয়া বিফল মনোরথ হুসেন গৌড়ে প্রত্যাবর্তন করিবেন বলিয়া প্রচার করিলেন এবং রাজা নীলাম্বরের নিকট সন্ধির প্রস্তাব প্রেরণ করিলেন কামতাপুর ত্যাগের পূর্বে হুসেন শাহের মহিষী কামতাপুর-রাজমহিষীর সহিত সাক্ষাতে অভিলাষিণী-এই অনুরোধবার্তা প্রেরণ করিলেন সাধারণ ভদ্রতার নিয়ম অনুযায়ী কামতাপুররাজ হুসেন-মহিষীর অভিলাষ পুর্ণ করিতে স্বীকৃত হইলেন হুসেন শাহের মহিষী রাজোচিত মর্যাদায় অভ্যর্থিতা হইলেন কিন্তু হুসেন-মহিষী অভ্যর্থনার মর্যাদা রক্ষা করেন নাই হুসেন মহিষী ও তাঁহার পরিচারিকাবৃন্দের পরিবর্তে ছদ্মবেশী মুসলিম সৈন্য কৌশলে বস্ত্রাবৃত ডুলিতে কামতাপুর রাজধানীতে প্রবেশ করিল মুসলিম সৈন্য অতর্কিতে রাজধানী আক্রমণ করিল-রাজা নীলাম্বর এই অতর্কিত আক্রমণের জন্য প্রস্তুত ছিলেন না-তিনি বন্দী হইলেন-তাঁহাকে গৌড়ে প্রেরণ করা হইল কিন্তু তিনি গৌড়ের পথ হইতেই পলায়ন করিলেন১০ কামতাপুর নগর বিধ্বস্ত হইল‘হাজো’ পর্যন্ত সমগ্র অঞ্চল মুসলিম অধিকারভুক্ত হইল কামরুপে একটি আফগান উপনিবেশ স্থাপিত হইল-তাহারা হিন্দু ভূস্বামীগণকে অধিকারচ্যুত করিয়া বিচার ও সামরিক ব্যবস্থার ভার গ্রহণ করিল হুসেন শাহের পুত্র এই অঞ্চলের শাসনকর্তা নিযুক্ত হইলেন১১ বুরুঞ্জীতে এই শাহজাদাকে দুলাল গাজী নামে আখ্যায়িত করা হইয়াছে সম্ভবত “দুলাল গাজী” “দানিয়েল” নামেরই বিকৃত রূপ ১৪৯৮-১৫০২ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে কামতাপুর অভিযান ‘আরম্ভ ও সমাপ্ত হইয়াছিলকারণ, ১৪৯৮ খ্রিস্টাব্দে দানিয়েল ছিলেন মুঙ্গেরে১২ এবং ১৫০২ খ্রিস্টাব্দে উৎকীর্ণ মালদহের একটি শিলালিপিতে এই বিজয় কাহিনী বর্ণিত আছে সুতরাং ১৫০২ খ্রিস্টাব্দের পূর্বেই এই বিজয় সংঘটিত হইয়াছিল

 

কামতাপুর বিজয়ের পর ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় অভিযান প্রেরিত হইয়াছিলএই অভিযান পরিচালকের নাম সম্বন্ধে মতদ্বৈধ আছে শিহাবউদ্দীন তালিসের বিবরণ অনুসারে জানা যায় যে, হুসেন শাহ চব্বিশ সহস্র সৈন্য ও একটি বিরাট নৌবহরসহ আসাম অভিযান করেনআহোম নরপতি মুসলিম সৈন্যের গতিরোধ না করিয়া পার্বত্য প্রদেশে আশ্রয় গ্রহণ করিলেন-সমতলভূমি মুসলিম সৈন্য কর্তৃক বিজিত হইল হুসেন শাহ সমভূমি অঞ্চল অধিকার করিয়া পুত্র দানিয়েলকে আসামে প্রতিষ্ঠিত করিবার ব্যবস্থা করিয়া গৌড়ে প্রত্যাবর্তন করিলেন১৩ এই সময়ে সুহুঙ্গ মুঙ্গ আসামের নরপতি ছিলেন১৪ বুরুঞ্জীর উল্লেখ অনুসারে তাঁহার রাজত্বকালেই আসাম রাজ্য মুসলিম কর্তৃক প্রথম আক্রান্ত হইয়াছিল এবং মুসলিম সেনাপতির নাম ছিল ‘বড়-উজীর’১৫ রিয়াজ-উস-সালাতীন ও তারিখ-ই-ফতে-ই-আসাম গ্রন্থের বিবরণ অনুসারে দানিয়েল বর্ষাগমের পূর্ব পর্যন্ত সমতলভূমির অধিকারী ছিলেন বর্ষাগমে আসামরাজ পার্বত্য অঞ্চল হইতে অবতরণ করিয়া মুসলিম সৈন্যকে চতুর্দিক হইতে বেষ্টন করিয়া তাহাদের পথরোধ করিলেন নির্বিচারে মুসলিম সৈন্য হত্যা করা হইলআহোম সেনাপতি বুরাই নদীতীর পর্যন্ত মুসলিম সৈন্যের পশ্চাদ্ধাবন করিয়া চল্লিশটি অশ্ব ও বিশটি কামান অধিকার করিয়া লইয়াছিলেন

 

মুসলিম কর্তৃক আসাম অভিযান ও বিজয় বিশেষ কোন একজন মুসলমান কর্তৃক সাধিত হয় নাই বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশ হইতে বিভিন্ন সুলতান কর্তৃক আসাম আক্রান্ত হইয়াছিল-সাময়িকভাবে বিজিতও হইয়াছিল সাধারণত বর্ষাগমের পূর্বেই আসামে অভিযান প্রেরিত হইত বর্ষাকালে নদীর জল অথবা বন্যার জলে দেশ প্লাবিত হইলে আহোম জাতি আক্রমণকারী মুসলমানদের খাদ্য চলাচল বন্ধ করিয়া দিত, প্রত্যাবর্তনের পথে পশ্চাৎদিক হইতে অতর্কিতে আক্রমণ করিয়া মুসলমানদিগকে বিব্রত করিত এবং অনেক সময় শত্রুকে সমূলে বিনাশ করিতএই জন্যই লৌকিক কিংবদন্তি অনুসারে আসাম বিজয়ের পরস্পর বিরোধী বিবরণের উল্লেখ করা যায় তারপর কখনও বা উত্তরবঙ্গের পথে, কখনও ব্রহ্মপুত্রের তীরবর্তী পথ অনুসরণ করিয়া কিংবা দক্ষিণে শ্রীহট্রের পথেও আসাম আক্রান্ত হইয়াছিল

 

মুসলমান বাদশাহ বা সেনাপতি দেশত্যাগ করিলেও অনেক সময়ে দুই-চারিজন মোল্লা বা ফকীর সেই দেশেই বসবাস করিতেন; এই সমস্ত মুসলিম ফকীর বা মোল্লা বঙ্গদেশীয় মুসলমানদের সঙ্গে যোগসূত্র রক্ষা করিতেন এবং মুসলিম আক্রমণে উৎসাহ ও প্রেরণা দিতেন

 

আসাম অভিযানের কারণ সম্বন্ধেও বলা হইয়াছে যে, আসাম অভিযান হুসেন শাহের খেয়াল বা দিগ্বিজয় আকাঙ্ক্ষাই নহে মুসলিম কর্তৃক আসাম বিজয়ের বারংবার প্রচেষ্টা, সাময়িক জয় এবং সর্বশেষে বিফলতা প্রবাদে পরিণত হইয়াছিল আসামরাজও অনেক সময় মুসলিম অধিকৃত স্থান আক্রমণ করিয়া মুসলমানদিগকে বিপর্যস্ত ও বিব্রত করিতেনবরবক শাহের সময়ে করতোয়ার তীরবর্তী অঞ্চল হইতে কামতারাজ মুসলিমদিগকে বিতাড়িত করিয়াছিলেনএই সমস্ত কাহিনীই হুসেন শাহ সম্যক অবগত ছিলেন-সুতরাং বাংলার সুলতান পদে অধিষ্ঠিত হইয়া হুসেন শাহের বিফল আক্রমণের প্রতিশোধ গ্রহণের প্রচেষ্টা অতি স্বাভাবিক সুলতান হুসেন শাহ কামতারাজ নীলাম্বর ও তাঁহার মন্ত্রীর বিরোধের পূর্ণ সুযোগ গ্রহণ করিয়াছিলেন মুসলিম ধর্ম প্রচারকগণও এই পুণ্য প্রচেষ্টায় মুসলিম সুলতানগণকে উৎসাহিত করিতেন-ইসমাইল গাজী নামক পীর মুসলিম কর্তৃক আসাম বিজয় কাহিনীর নায়করূপে চিরস্মরণীয় হইয়া আছেন

 

হুসেন শাহের রাজত্বকাল (৮৯৯/১৪৯৩ হইতে ৯২২/১৫১৭ খ্রিস্টাব্দ) ছাব্বিশ বৎসরএই সময়েই কামতাপুর আক্রান্ত হইয়াছিল ৯০০/১৪৯৪ খ্রিস্টাব্দে শার্কী সুলতান হুসেন শাহের সহিত দিল্লির সম্রাট সিকান্দর শাহের যুদ্ধ হইয়াছিল-সেই যুদ্ধে বঙ্গের সুলতান আলাউদ্দীন হুসেন শাহও জড়িত হইয়া পড়েনতিনি ৯০১/১৪৯৫ খ্রিস্টাব্দে সুলতানজাদা দানিয়েলকে দিল্লির সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে অধিনায়ক নিযুক্ত করেন দানিয়েল ১৪৯৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বিহারে ছিলেন-ইহা মুঙ্গেরে আবিস্কৃত শাহনফা নামক ফকীরের দরগায় আবিস্কৃত শিলালিপি হইতে জানা যায় সুতরাং কামতাপুর আক্রমণ ৯০৩/১৪৯৮ খ্রিস্টাব্দের পূর্বে হয় নাই অহমিয়া ভাষায় লিখিত বুরুঞ্জী হইতে জানা যায় যে, ৯০৩/১৪৯৮ খ্রিস্টাব্দে কামতাপুর বিজিত হইয়াছিল এবং দানিয়েল আসামেও পিতার প্রতিনিধিত্ব করিয়াছিলেন মালদহে আবিস্কৃত ৯০৭/১৫০২ খ্রিস্টাব্দে উৎকীর্ণ শিলালিপি এই বিষয়টি সমর্থন করেউক্ত শিলালিপিতে বর্ণিত আছে যে, ৯০৭/১৫০২ খ্রিস্টাব্দে হুসেন শাহ কামরুপ ও কামতাপুর আক্রমণ করিয়াছিলেনঅন্য একটি অহমিয়া বুরুঞ্জীর উল্লেখ অনুসারে স্যার এডওয়ার্ড গেইট তাঁহার বিখ্যাত ‘আসামের ইতিহাসে’ উল্লেখ করিয়াছেন যে, কামতাপুর ধ্বংসের বিশ বৎসর পরে অর্থাৎ ৯২৭/১৫২২ খ্রিস্টাব্দে হুসেন শাহ আহোম রাজ্য আক্রমণ করিয়াছিলেন কিন্তু ৯২৭/১৫২২ খ্রিস্টাব্দের পূর্বেই হুসেন শাহের মৃত্যু হইয়াছিল সুতরাং কামতাপুর ধ্বংসের বিশ বৎসর পরে হুসেন আহোমরাজ্য আক্রমণ করিয়াছিলেন-এই উক্তি নির্ভুল নহে হুসেন শাহ আসাম আক্রমণ করিয়াছিলেন সত্য, তবে এই আক্রমণের তারিখ সম্বন্ধে মতভেদ রহিয়াছে

 

বিভিন্ন সময়ে আসাম মুসলিম কর্তৃক আক্রান্ত হইয়াছিল বলিয়াই বিভিন্ন বিবরণে বিভিন্ন সময় উল্লিখিত হইয়াছে সমস্ত প্রমাণগুলি একত্র আলোচনা করিলে মনে হয় ৯০৩/১৪৯৮ খ্রিস্টাব্দে কামতাপুর অভিযান আরম্ভ হয় এবং কামতাপুর সাময়িকভাবে বিজিত হয় অতঃপর হুসেন শাহ আহোম রাজ্যের বিরুদ্ধে অভিযান করেনআহোম রাজ তাঁহাকে বাধাপ্রদান না করিয়া পার্বত্য অঞ্চলে আশ্রয় গ্রহণ করেন হুসেন শাহ তাঁহার পুত্র দানিয়েলকে তথায় প্রতিনিধি নিযুক্ত করেন দানিয়েল সুলতানের প্রতিনিধিস্বরূপ আহোম রাজ্যে অবস্থান করিতেছিলেন বর্ষাগমে হিন্দুগণ মুসলিম বাহিনীকে বিপর্যস্ত করিয়া তুলিল কিন্তু মুসলমানগণ এই পরাজয় এবং বিপর্যয় সত্ত্বেও বারংবার আসাম আক্রমণ করে সুতরাং কেহ কেহ অনুমান করেন যে, আসাম অভিযান সুদীর্ঘকাল ব্যাপিয়া চলিয়াছিলকেহ কেহ বলেন কামতাপুরের রাজধানীর অবরোধ চৌদ্দ বৎসরব্যাপী দীর্ঘ হইয়াছিল; তবে আসাম অভিযান সম্পূর্ণ নিরর্থক হয় নাই অধিকৃত অঞ্চলে বহু মুসলিম মোল্লা ও সৈন্য স্থায়ীভাবে বাস করিয়া এ অঞ্চলে ইসলাম প্রচার করেন

 

হুসেন শাহের উড়িষ্যা অভিযান

 

উড়িষ্যার সীমানা বাংলার সীমান্তকে স্পর্শ করিত এবং সময়ে সময়ে বঙ্গের সুলতানগণের দুর্বলতার সুযোগে উড়িষ্যাধিপতি বঙ্গের অভ্যন্তরভাগেও রাজ্যসামী বিস্তার করিয়াছিলেন বাংলার সুলতানগণও বিভিন্ন সময়ে উড়িষ্যা আক্রমণ করিয়াছিলেন-সাময়িকভাবে কয়েকবার জয়ীও হইয়াছিলেন, পরাজিতও হইয়াছিলেন

 

এই উড়িষ্যা অভিযান ছিল আসাম অভিযানের মতই এক বংশানুক্রমিক কার্যক্রম তার উপর উড়িষ্যা অভিযান ছিল আসাম অভিযানের মতই এক বংশানুক্রমিক দেববিগ্রহ ভগ্ন এবং মূর্তি পূজকদিগকে বিধ্বস্ত করা পুণ্য কর্ম বলিয়া মুসলমানগণ বহুবার উড়িষ্যায় অভিযান করিয়াছে মন্দিরে সঞ্চিত ধনরত্নের প্রতিও সৈন্যদের লোভ ছিল সুতরাং হুসেন শাহের উড়িষ্যা অভিযানের পশ্চাতে ছিল মুসলমানের রাজ্যবিস্তার আকাঙ্খা, ধর্মপ্রচারের স্পৃহা এবং হিন্দুমন্দির ধ্বংসের উন্মাদনা

 

রিয়াজ-উস-সালাতীনের উল্লেখ অনুসার হুসেন শাহ গৌড় হইতে উড়িষ্যা পর্যন্ত সমস্ত ভূভাগ জয় করিয়াছিলেন এবং ঐ অঞ্চলের সমস্ত নরপতিকে পরাজিত করিয়াছিলেন রজনীকান্ত চক্রবর্তী মহাশয় তাঁহার ‘গৌড়ের ইতিহাস’ গ্রন্থে লিখিয়ানের যে, হুসেন শাহ উড়িষ্যা আক্রমণ করিয়াও বিশেষ ক্ষতি করিতে পারেন নাই১৭ চৈতন্যভাগবতে উল্লিখিত আছে যে, মুসলমান সেনাদল বহু দেবমন্দির ও দেবমূর্তি ধ্বংস করিয়াছিল নিম্নে উদ্ধৃত ‘চৈতন্য ভাগবতের’ দুইটি পঙক্তি হইতেই উড়িষ্যায় মুসলিম সৈন্যের কীর্তিকাহিনী অনুমান করা যায়-

 

কে হুসেন শাহা সর্ব উড়ষ্যার দেশে

দেবমূর্তি ভাঙ্গিলেক দেউল বিশেষে

 

মুসলিম সৈন্য কর্তৃক উড়িষ্যা বিজয়ের কাহিনী উড়িষ্যার কোন গ্রন্থ বা লিপিপ্রমাণে উল্লিখিত নাই উড়িষ্যার জগন্নাথ মন্দিরের ঘটনা-বিবরণের তালিকায় বা মাদলা পঞ্জিকার লিখিত আছে যে, ১৫০৯ খ্রিস্টাব্দে উড়িষ্যা গৌড়ীয় মুসলিম সেনা কর্তৃক আক্রান্ত হইয়াছিলএই অভিযানের নায়ক ছিলেন ইসমাইল গাজী মুসলিম সেনাপতি ইসমাইল গাজী উড়িষ্যা আক্রমণ করিয়া পুরীর পুণ্যধাম ধ্বংস করিয়াছিলেনএই আক্রমণে মুসলিম সৈন্যের হিন্দুমন্দির ধ্বংস ও অপবিত্র করার প্রচেষ্টা আংশিক ফলবর্তী হইয়াছিল

 

অবশ্য এই সফলতার কারণ উড়িষ্যাধিপতি প্রতাপরুদ্রদেবেরে অনুপস্থিতিতিনি কার্যোপলক্ষে রাজ্যের দক্ষিণাংশে গমন করিয়াছিলেনকারণ তৈলঙ্গের অধিকারকে কেন্দ্র করিয়া তিনি কখনও বিজয়নগর এবং কখনও গোলাকোণ্ডার সহিত যুদ্ধে ব্যাপৃত ছিলেন মুসলিম আক্রমণ ও পুরীধাম লুণ্ঠনের সংবাদ পাইয়া প্রতাপরুদ্র ইসমাইল গাজীর বিরুদ্ধে অগ্রসর হইলেন ইসমাইল গাজী গড়মান্দারণে আশ্রয় গ্রহণ করিলেন প্রতাপরুদ্র গড়মান্দারণ অবরোধ করিয়া মুসলিমগণকে বিপর্যস্ত করিলেন কিন্তু তাঁহার কর্মচারী গোবিন্দ বিদ্যাধরের বিশ্বাসঘাতকতায় প্রতাপরুদ্র গড়মান্দারণে অবরোধ উত্তোলন করিতে বাধ্য হইলেন মুসলমানগণ নিশ্চিন্ত হইল

 

হুসেন শাহের উড়িষ্যা অভিযানের তারিখ বা ফলাফল সম্বন্ধে সঠিক তথ্য জানা যায় না গোলাম হুসেন বলেন যে, গৌড় হইতে উড়িষ্যা পর্যন্ত অঞ্চল বিজিত হইয়াছিল বিজিত হউক বা না হউক মুসলিম সৈন্যের গতি অপ্রতিহত হইয়াছিল ইহা নিশ্চিত এবং নিন্দু জমিদারবর্গ বা স্থানীয় রাজনবর্গ মুসলিম সৈন্যকে বাধাপ্রদান করে নাই-কারণ, বোধ হয় তাহারা তাহাদের অধিনায়ক প্রতাপরুদ্রদেবের অনুপস্থিতিতে মুসলিম সৈন্যের গতিরোধ করিতে সাহস করে নাইপরে অবশ্য মুসলিমগণ প্রতাপরুদ্রেবের আগমনে গড়মান্দারনে আশ্রয় গ্রহণ করিয়া আত্মরক্ষা করিতে বাধ্য হইয়াছিল হুসেন শাহ সম্ভবত স্থায়ীভাবে উড়িষ্যার কোন অংশ জয় করিতে পারেন নাই

 

মাদলা পঞ্জিকা অনুসারে মুসলিম সৈন্য ১৫০৯ খ্রিস্টাব্দে উড়িষ্যা আক্রমণ ও পুরীধাম লুণ্ঠন করিয়াছিল কিন্তু চৈতন্যদেবের ভ্রমণপঞ্জী হইতে জানা যায় যে, ১৫০৯ হইতে ১৫১৬ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে তিনি পুরী বা নীলাচলে গমন করেন১৫০৯ খ্রিস্টাব্দে চব্বিশ বৎসর বয়সে তিনি সন্ন্যাস গ্রহণ করেন১৯ মহাত্মা শিশিরকুমার ঘোষ তাঁহার ‘অমিয় নিমাইচরিতে’ লিখিয়াছেন যে, মহাপ্রভুর নীলাচলে গমণের সময়ে দুই রাজ্যের সীমান্তে বিরোদ চলিতেছিল এবং শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু সীমান্ত কর্মচারী রামচন্দ্র খানের সাহায্যে ছত্রভোগে গঙ্গা অতিক্রম করেন২০ শিশিরকুমার আরও লিখিয়াছেন, ১৫১৩ খ্রিস্টাব্দে মহাপ্রভু যখন বঙ্গে প্রত্যাবর্তন করেন তখনও সীমান্ত রুদ্ধ ছিল এবং সীমান্তে প্রচণ্ড গোলমাল চলিতেছিল২১ এই অনিশ্চিত অবস্থা ও গোলযোগের কথা চিন্তা করিয়াই শান্তিপুরের ভক্তবৃন্দ এবং ছাত্রভোগের গ্রামপতি রামচন্দ্র খান মহাপ্রভুকে তখন নীলাচল গমনে নিরস্ত করিতে চেষ্টা করিয়াছিলেন২২ মুদ্রা-প্রমাণ অনুসারে ৯১০-১৫০৪-৫ খ্রিস্টাব্দেই হুসেন শাহ কামরুপ কামতা এবং জাজনগর-উড়িষ্যা বিজয় করিয়াছিলেন২৩  কিন্তু এই মুদ্রা-প্রমাণ গ্রহণ করা কঠিন, কারণ একসঙ্গে তিনটি অভিযান পরিচালনা ও বিজয় অসম্ভব বলিয়াই মনে হয়তবে সকল তারিখ একত্র বিবেচনা করিলে মনে হয় হুসেন শাহের আসাম ও উড়িষ্যা অভিযান দীর্ঘকাল ধরিয়া চলিয়াছিল

 

 

ত্রিপুরার যুদ্ধ

 

ত্রিপুরা রাজ্যের সহিত মুসলমানদের প্রীতির সম্বন্ধ ছিল না হুসেন শাহের সিংহাসনারোহণের পূর্ব হইতেই ত্রিপুরা রাজ্যের সহিত গৌড়ের মুসলমান সুলতানের বিরোধ চলিতেছিল হুসেন শাহ রাজত্বের প্রথমভাগে দিল্লি, আসাম ও উড়িষ্যার বিরুদ্ধে যুদ্ধে ব্যাপৃত থাকায় ত্রিপুরার দিকে দৃষ্টিক্ষেপ করিতে পারেন নাইকারণ তিনি মনে করিয়াছিলেন যে, যখন ইচ্ছা ত্রিপুরা জয় করিতে পারিবেন কিংবা ত্রিপুরা বিজয় খুব কষ্টসাধ্য হইবে না রাজমালা বা ‘ত্রিপুরার ইতিহাস’ অনুসারে হুসেন শাহ চারিবার ত্রিপুরা বিজয়ের চেষ্টা করিয়াছিলেন, কিন্তু ত্রিপুরেশ্বর মহারাজ ধন্যমাণিক্য এবং সেনাপতি রায় চরবাগের যত্নে ও কৌশলে বিফল মনোরথ হইয়াছিলেন

 

হুসেন  শাহ রাজত্বের প্রথমভাগে রাজ্যের অন্যান্য অঞ্চলে যুদ্ধে ব্যাপৃত থাকায় ধন্যমাণিক্য নিজেকে নিরাপদ মনে করিয়া অনেকটা নিশ্চিন্ত ও নিশ্চেষ্ট ছিলেনএই সুযোগে মুসলিমগণ ত্রিপুরা আক্রমণ করিয়া ৯১৯/১৫১৩ খ্রিস্টাব্দের পূর্বেই ত্রিপুরার কোন অংশ জয় করিয়াছিল সোনারগাঁও অঞ্চলে আবিস্কৃত একটি শিলালিপি হইতে জানা যায় যে, ৯১৯/১৫১৩ খ্রিস্টাব্দে খাওয়াস খান ত্রিপুরার সর-ই-লস্কর (সৈন্যাধ্যক্ষ এবং ইকলিস মুয়াজ্জমাবাদের উজীর ছিলেন২৪ রাজ্যের অংশবিশেষও সাময়িকভাবে বিজিত না হইলে কোন উজীরের নাম উল্লিখিত হইত না মুসলমানগণ প্রথম অভিযানে গোমতী নদী পর্যন্ত অগ্রসর হইয়াছিল এবং অত্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হইয়াছিল অভিযান অসম্পূর্ণ রাখিয়াই মুসলিম সৈন্য গৌড়ে প্রত্যাবর্তন করিতে বাধ্য হইল

 

হুসেন শাহ এই পরাজয়ে নিরুৎসাহ হইলেন নাতিনি গৌর মল্লিক নামক একজন বিচক্ষণ সেনাপতির অধীনে ত্রিপুরায় দ্বিতীয় অভিযান প্রেরণ করিলেন মুসলিম সৈন্য দ্বিগুণ উৎসাহে মিহিরকুল নদীর তীর অনুসরণ করিয়া ত্রিপুরাভিমুখে অগ্রসর হইল মিহিরকুল মেঘনা নদীর একটি শাখা-এই নদীর তীরে ত্রিপুরাধিপতির একটি দুর্গ ছিল মুসলিম সৈন্য বিনাবাধায় মিহিরকুলতীরস্থ দুর্গ অধিকার করিল ত্রিপুরা-সেনাপতি চয়বাগ মুসলিম সৈন্যের পতিরোধের কোন চেষ্টা করিলেন না কিংবা মুসলিম সৈন্যের যথেচ্ছ অগ্রসরে বাধাপ্রদান করিলেন না ত্রিপুরার সৈন্য চয়বাগের অধীনে সোনামাটিয়া দুর্গে আশ্রয় গ্রহণ করিলগৌর মল্লিক মহা উৎসাহে ত্রিপুরার রাজধানী রাঙ্গামাটি অভিমুখে সসৈন্যে অগ্রসর হইলেনরায় চয়বাগ পশ্চাৎ দিকে গোমতী নদীতে বাঁধ বাঁধিয়া জলস্রোত আবদ্ধ করিয়াছিলেন মুসলিম সৈন্য গোমতী নদী শুস্ক মনে করিয়া অতিক্রম করিতে আরম্ভ করিল অকস্মাৎ পূর্ব ব্যবস্থা অনুযায়ী রায় চয়বাগ গোমতীর বাঁধ খুলিয়া দিলেন রুদ্ধ জলস্রোত তীব্রবেগে সমস্ত নদী প্লাবিত করিয়া দিল মুসলিম সৈন্য স্রোতে ভাসিয়া গেলঅতি সামান্য সংখ্যক মুসলিম কোনমতে প্রাণ রক্ষা করিয়া নিকটস্থ চণ্ডীগড় দুর্গে আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছিল কিন্তু ত্রিপুরার সৈন্যগণ সেখানেও মুসলমানদের স্বস্তি দিল না তাহারা গভীর নিশীথে চণ্ডীগড়ে প্রবেশ করিয়া মুসলিম সৈন্য প্রায় নিশ্চিহ্ন করিল সামান্য কয়েকজন মাত্র পলায়ন করিয়া হুসেন শাহের নিকট পরাজয়ের সংবাদ দিতে চলিলরায় চয়বাগ পলায়মান সৈন্যদের অনুসরণ করিয়া চট্টগ্রামের অংশবিশেষ অধিকার করিলেন

 

হুসেন শাহ পরাজয়ের প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য হাতিয়ান খান নামক একজন সাহসী সৈন্যাধ্যক্ষকে ত্রিপুরার বিরুদ্ধে প্রেরণ করিলেন হাতিয়ান খান পুনরায় গোমতী নদীর তীর অনুসরণ করিয়া চলিলেন চরবাগ কুমিল্লার নিকট যুদ্ধে জয়লাভ করিলেন কিন্তু তাঁহারই কৌশলে হাতিয়ান খানের সৈন্যদল পুনরায় গোমতীর জলে সমাধি লাভ করিয়া (ধর্মযুদ্ধ বা জেহাদের) পুণ্য অর্জন করিল হুসেন শাহ পরাজয়ের অপমানে স্বয়ং সৈন্য পরিচালনার ভার গ্রহণ করিলেন হাতিয়ান খান পদচ্যুত হইলেন

 

হুসেন শাহ বিরাট সেনাবাহিনী লইয়া স্বয়ং ত্রিপুরা অভিমুখে অগ্রসর হইলেন চতুর্থ অভিযানের ফল কি হইয়াছিল তাহার পূর্ণ বিবরণ ‘রাজমালা’তে উল্লেখ নাই সম্ভবত হুসেন শাহ তাঁহার পূর্ববর্তী হাতিয়ান খান কিংবা গৌর মল্লিকের মত বিপর্যস্ত হন নাই কৈলাগড়ে উভয় সৈন্য পরস্পরের সম্মুখীন হইয়াছিল২৫ ধন্যমাণিক্যও স্বয়ং এই সংগ্রামে অংশগ্রহণ করিয়াছিলেন এই যুদ্ধের ফলে ত্রিপুরার একাংশ গৌড়রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হইয়াছিল এবং ঐ অঞ্চলের শাসনের জন্য একজন কর্মচারীও নিযুক্ত হইয়াছিলেন২৬ এই সময়ে চট্টগ্রামও পুনরায় হুসেন শাহের হস্তগত হইয়াছিলএই যুদ্ধের সময়ে আরাকান-নরপতি চট্টগ্রাম আক্রমণ করিয়াছিলেন এবং আরাকান রাজের আক্রমণে উহা হুসেন শাহের হস্তচ্যুত হইয়াছিল সম্ভবতঃ আরাকানরাজের আক্রমণের জন্যই হুসেন শাহ ত্রিপুরার বিরুদ্ধে সমস্ত সৈন্য সমাবেশ করিতে পারেন নাই

 

ত্রিপুরা ও আরাকান যুদ্ধ একই সময়ে সংঘটিত হইয়াছিল কি না, কিংবা ত্রিপুরা যুদ্ধের পরে আরাকানের যুদ্ধ হইয়াছিল, এ সম্বন্ধে সমসাময়িক ইতিহাস নিরব যুদ্ধের ফলাফল সম্বন্ধেও বিশেষ কোন উল্লেখ নাই রাজমালার বর্ণনানুসারে হুসেন শাহের ত্রিপুরা-যুদ্ধে ব্যস্ততার (লিপ্ততার) সুযোগ গ্রহণ করিয়া আরাকানরাজ্য চট্টগ্রাম আক্রমণ করেন এবং অধিকার করেন২৭ আরাকানরাজের অগ্রগতি প্রতিহত করিবার জন্যই সুলতানজাদা নসরৎ খানের অধীনে একদল সৈন্য প্রেরিত হইয়াছিল পরমেশ্বর এবং শ্রীকর নন্দী এই অভিযানকাহিনী উল্লেখ করিয়াছেনএই অভিযানেই পরাগল খান ও তাঁহার পুত্র ছুটী খানের উল্লেখ পাওয়া যায় কিংবদন্তি অনুসারে সুলতানজাদা নসরৎ শাহই প্রথমে চট্টগ্রাম অধিকার করিয়াছিলেন চট্টগ্রাম পুনরধিকার ব্যাপারে আলকা হোসেনী নামক একজন আরব বণিক কয়েকখানি জাহাজ এবং অর্থের দ্বারা গৌড়ের সুলতানকে সাহায্য করিয়াছিলেন এবং বঙ্গে বিপুল প্রতিপত্তি অর্জন করিয়াছিলেন২৮ নসরৎ খানের প্রত্যাবর্তনের পর পরাগল খান চট্টগ্রামের সামরিক শাসনকর্তা নিযুক্ত হনফেনী নদীর তীরে শিবির সংস্থাপন করিয়া পরাগল খান ও তাঁহার পুত্র ছুটী খান আরাকান সৈন্যের গতি প্রতিরোধ করেন এবং ত্রিপুরারাজ্যের প্রতিও তীক্ষ্ম দৃষ্টি রাখেননসরৎ শাহ কিংবা পরাগল খান ও ছুটী খান কর্তৃক চট্টগ্রাম অভিযানের তারিখ সঠিক জানা যায় না পর্তুগীজ দূত জাওয়ো-দা-সিলভারি (Joas-De-Silverio) ১৫১৭ খ্রিস্টাব্দে চট্টগ্রামে উপস্থিত হন তাঁহার উক্তি অনুসারে জানা যায় যে, হুসেন শাহ ১৫১৭ খ্রিস্টাব্দের পূর্বেই চট্টগ্রাম অধিকার করিয়াছিলেন-কিন্তু ১৫১৭ খ্রিস্টাব্দে চট্টগ্রামে উপস্থিত হইয়া তিনি দেখেন যে, উক্ত বন্দরটি তখন বঙ্গরাজের অধীনে ছিলদ্য ব্যারস (De Barros) বলিয়াছেন যে, আরাকান রাজও বঙ্গরাজের অধীন সামন্ত ছিলেন

 

হুসেন শাহ তাঁহার সুদীর্ঘ রাজত্বে কামতাপুরের খেন রাজ্য ধ্বংস করেন, উড়িষ্যা ও ত্রিপুরারাজ্যের কিয়দংশ অধিকার করেন, শার্কী সুলতানগণের অধীন মগধরাজ্য ও তিনি জয় করেন একমাত্র আহোমরাজ্য অভিযানেই তাঁহাকে ব্যর্থতার সম্মুখীন হইতে হইয়াছিল তাঁহার রাজ্য সুসংবদ্ধ ছিল এবং তাঁহার সুশাসনে রাজ্যে কখনও ব্যাপক প্রজাবিদ্র্যেহ হয় নাই রিয়াজ-উস-সালাতীনের মতে হুসেন শাহ দীর্ঘ সপ্তবিংশ কিংবা উনত্রিংশ বৎসর রাজত্ব করিয়াছিলেন গোলাম হুসেনের মতানুসারে ৯২৭/১৫২০ খ্রিস্টাব্দে হুসেন শাহের মৃত্যু হইয়াছিল২৯ কিন্তু ৯২৫/১৫১৮ খ্রিস্টাব্দে ফতেহাবাদ ও হোসেনাবাদ মুদ্রাশালায় মুদ্রিত হুসেন শাহের পুত্র নসরৎ শাহের মুদ্রা আবিস্কৃত হইয়াছে-সুতরাং এই মুদ্রাতত্ত্বের প্রমাণের উপর সিদ্ধান্ত করিয়াই রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয় বলিয়াছেন যে, উক্ত বর্ষেই হুসেন শাহের মৃত্যু হইয়াছিল৩০

 

রিয়াজ-উস-সালাতীনের উল্লেখ অনুযায়ী হুসেন শাহের আঠারোটি পুত্র ছিল তাঁহাদের মধ্যে জ্যেষ্ঠপুত্র দানিয়াল আহোম যুদ্ধে নিহত হইয়াছিলেনডাঃ হবিবুল্লা বলেন যে, ১৫১৫ খ্রিস্টাব্দে হুসেন শাহ তাঁহার পুত্র নসরৎ শাহকে যুবরাজ পদে অভিষিক্ত করিয়া মুদ্রাঙ্কনের অনুমতি দিয়াছিলেনএই নসরৎ শাহের মুদ্রা আবিস্কৃত হইয়াছে কিন্তু ডাঃ হবিবুল্লার উক্তি সম্বন্ধে সন্দেহ আছে-পিতা বর্তমানে পুত্রকে সিংহাসনের ভবিষ্যৎ উত্তরাধিকারী মনোনয়নের প্রথা ইসলামে পাওয়া যায় কিন্তু মুদ্রাঙ্কনের অধিকার দিলে যে স্বাধীনতার সমতুল হইয়া যায়! এই অধিকার প্রদান রাজনীতির বিরোধী হুসেন শাহের মত বিচক্ষণ ব্যক্তি যে সাম্রাজ্যের স্বাতন্ত্র্য সহজে নষ্ট করিবেন তাহা মনে হয় না সুতরাং ফতেহাবাদ ও হোসেনাবাদের মুদ্রাশালা হইতে ৯২৫/১৫১৮ খ্রিস্টাব্দে নসরৎ শাহ কর্তৃক মুদ্রা প্রচলন প্রমাণ করে যে, তিনি পিতার জীবদ্দশায় বিদ্রোহী হইয়া স্বীয় নামে মুদ্রা প্রচলন করিয়াছিলেন কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি পিতার বশ্যতাই স্বীকার করিয়াছিলেনগৌড়ে এবং সুবর্ণগ্রামে৩২ আবিস্কৃত শিলালিপি হইতে জানা যায় যে, ৯২৫/১৫১৯ (আগস্ট) খ্রিস্টাব্দে হুসেন শাহের রাজত্বকালে ঐ দুই স্থানে মসজিদ নির্মিত হইয়াছিল; সুতরাং ৯২৫/১৫১৮ খ্রিস্টাব্দে হুসেন শাহের মৃত্যু হইতে পারে না হুসেন শাহের মৃত্যুর পর তাঁহার পুত্র নসরৎ শাহ ও গিয়াসউদ্দীন সিংহাসন লাভ করিয়াছিলেন

 

হুসেন শাহের রাজ্যসীমা সুবিস্তৃত ছিল এবং রাজ্য সুসংবদ্ধ ছিল তাঁহার রাজ্যসীমা উত্তর-পশ্চিমে সরণ ও বিহার (মুঙ্গের ও বিহার শরীফ), দক্ষিণ-পশ্চিমে মন্দারণ ও চব্বিশ পরগণা, উত্তর-পূর্বে আসামের হাজো এবং দক্ষিণ-পূর্বে শ্রীহট্ট ও চট্টগ্রাম স্পর্শ করিয়াছিল

 

হুসেন শাহের জীবন বিচিত্র ঘটনার সমষ্টিতিনি শাহজাদা হইয়া জন্মগ্রহণ করেন নাই-নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়া এবং নানা অবস্থা বিপযয়ের মধ্যে তিনি গৌড় দরবারে কার্য লাভ করেন এবং স্বীয় প্রতিভাবলে গৌড় সিংহাসনের অতি নিকটে উপস্থিত হন বাংলার সিংহাসনের জন্য যুদ্ধবিগ্রহের প্রত্যক্ষদর্শী রূপে তিনি বহু অভিজ্ঞতা অর্জন করিয়াছিলেনতিনি হাবসী রাজত্বে সেনাপতি পদে নিযুক্ত ছিলেন হাবসী অত্যাচারে যে তাঁহার কোন হাত ছিল না, এমন কথা বলা যায় না সিংহাসন লাভের উদ্দেশ্যে হাবসী সমর্থন লাভের জন্য তিনি নিশ্চয়ই হাবসী সৈন্যাধ্যক্ষ ও প্রাসাদরক্ষীদের সহায়তা করিয়াছিলেন; নচেৎ হাবসীগণ তাঁহাকে সাহায্য করিত না স্বার্থসিদ্ধির জন্য কোন উপায় বা সুযোগ তিনি প্রত্যাখ্যান করেন নাই বা ব্যর্থ হইতে দেন নাই সিংহাসন লাভ করিয়া তিনি সহস্র সহস্র হাবসী সৈন্যকে নিঃসংকোচে নির্মমভাবে হত্যা করিয়াছিলেন; প্রাসাদরক্ষীদিগকে নির্বাসিত করিয়াছিলেন ইহাতে তাঁহার দূরদৃষ্টি ও দৃঢ়চিত্ততা প্রকাশ পায় হিন্দু-মুসলিম সম্ভ্রান্ত বংশীয়গণের সহিত সহযোগিতা করার প্রয়োজনীয়তাও তিনি অনুভব করিয়াছিলেন জনসাধারণ বহুকাল যুদ্ধবিগ্রহ, অত্যাচারে অতিষ্ঠ হইয়া স্বস্তি ও শান্তির জন্য আকুল হইয়াছিল ইংলণ্ডে দীর্ঘকালব্যাপী গোলাপের যুদ্ধের বিভীষিকায় অতিষ্ঠ হইয়া ইংলণ্ডবাসী যেমন সপ্তম হেনরীর কঠোর শাসন সমর্থন করিয়াছিল, বঙ্গদেশও তেমনি পরবর্তী ইলিয়াসী বংশের দুর্বল শাসন ও হাবসী অত্যাচারে জর্জরিত হইয়া হুসেন শাহের দৃঢ় শাসনের সমর্থন ও সহযোগিতা করিয়াছিল

 

রাজ্যে শৃঙ্খলা স্থাপন করিয়াই হুসেন শাহ এক নূতন বৈদেশিক নীতির সূচনা করেন বাংলার চতুস্পার্শ্বে-আসাম, উড়িষ্যা, ত্রিপুরা প্রভৃতি রাজ্যগুলি ছিল অমুসলমান রাজ্য-সুতরাং হুসেন শাহ এইসকল বিধর্মী রাজ্যের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করিয়া পুণ্যার্জনের প্রয়াস পাইয়াছিলেন ১৪৯৪-১৫১৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ক্রমাগত একুশ বৎসরকাল তিনি বিভিন্ন শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত ছিলেন এবং আসামযুদ্ধ ব্যতীত কোথাও তিনি পরাজিত হন নাই

 

যোদ্ধারূপে হুসেন শাহ বরবক শাহ হাবসীকে পরাজিত করিয়াছিলেন অন্তঃপুরে প্রবেশ করিয়া সিদি বদরকে হত্যা করিয়া দুঃসাহসিকতার পরিচয় প্রদান করেন যুদ্ধ পরিচালনার কৃতিত্ব তাঁহার ছিলতিনি দিল্লির সুলতান সিকান্দর লোদীর বিরুদ্ধে জৌনপুরের শার্কী সুলতানকে আশ্রয় প্রদান করিয়া রাজনৈতিক বুদ্ধির পরিচয় দিয়াছিলেনআসাম যুদ্ধে পরাজয়ের জন্য তাঁহার দায়িত্ব ছিল না উড়িষ্যা যুদ্ধের উদ্দেশ্য আংশিক সফল হইয়াছিল ত্রিপুরা যুদ্ধে বারংবার বিধ্বস্ত হইয়াও তিনি নিরুৎসাহ হন নাই-শেষ পর্যন্ত স্বযং সৈন্য পরিচালনা করিয়াছিলেন-তখন তাঁহার বয়স ষাটের উর্ধ্বে

 

রাজ্যজয় রাজার কর্তব্য বিবেচনা করিলেও হুসেন শাহ শাসন ব্যাপারেও নিশ্চেষ্ট ছিলেন নাতিনি রাজকর্মচারী নিয়োগে ধর্ম অপেক্ষা যোগ্যতার সম্মান দিয়াছেন তাঁহার রাজ্যের উজীর ছিলেন পুরন্দর খান বা পুরন্দর বসু, গৌর মল্লিক ছিলেন তাঁহার সেনাপতি; রূপ ও সনাতন দুই ভাই ছিলেন তাঁহার রাজ্যের স্তম্ভস্বরূপ তাঁহাদের মধ্যে সনাতন ছিলেন ব্যক্তিগত কর্মাধ্যক্ষ (দবীর খাস), রূপ ছিলেন রাজস্ব সচিব (সাকর মল্লিক) মুকুন্দ দাস ছিলেন তাঁহার প্রধান চিকিৎসক, তাঁহার দেহরক্ষী ছিলেন কেশবছত্রী, অনুপ ছিলেন মুদ্রাশালার অধ্যক্ষ হিন্দু কর্মচারী নিয়োগের অন্তরালে হুসেন শাহের হিন্দু মেধা ও কর্মদক্ষতার উপর বিশ্বাসের পরিচয় পাওয়া যায় উহাতে মনে হয় শৈশবকাল হইতেই তিনি হিন্দুর সংস্পর্শে আসিয়াছিলেন-আরব দেশ হইতে এই দেশে আসেন নাইকোন আরববাসীর পক্ষে হঠাৎ সুদূর বঙ্গদেশে আসিয়া অতখানি উদারতা অসম্ভব

 

হুসেন শাহের এই হিন্দু-নিয়োগ নীতির পশ্চাতে হিন্দুপ্রীতি অপেক্ষা রাষ্ট্র রক্ষার প্রয়োজনই অধিকতর অনুভূত হইয়াছিল হিন্দুগণ মুলমান সুলতানের বিরুদ্ধে সিংহাসনের ষড়যন্ত্রে যোগ দিত না-তাহারা স্বল্পে সন্তুষ্ট থাকিত তাহারা সাধারণত আহত হইলেও আঘাত করিত না হুসেন শাহ হিন্দুর শান্তিপ্রিয় মনোভাবের সঙ্গে সম্যক পরিচিত ছিলেন বলিয়া তাহাদের নমনীয় মনোবৃত্তিকে রাষ্ট্রের কল্যাণে নিযুক্ত করিবার ব্যবস্থা করিয়াছিলেন তাছাড়া রাজদরবারে কার্যহেতু এই হিন্দু রাজকর্মচারী গোষ্ঠী দরবারী রীতিনীতি গ্রহণ করিল এবং মুসলিম ভাবধারাও অলক্ষিত তাহাদের মধৌ্য প্রবেশ করিল

 

হুসেন শাহ রাজ্যের বিভিন্ন অংশে উপযুক্ত কর্মচারী নিয়োগ করিয়া সুশাসনের ব্যবস্থা করিয়াছিলেন পরাগল খান ও তাঁহার পুত্র ছুটী খান চট্টগ্রাম অঞ্চলের সামরিক শাসনকর্তা ও সেনানায়ক নিযুক্ত হইয়াছিলেন ত্রিহুত অঞ্চলে হুসেন শাহের শ্যালক আলাউদ্দীন ও মকদুম-ই-আলম শাসনকর্তা নিযুক্ত হইয়াছিলেন বাবরের আত্মজীবনীর বর্ণনা অনুসারে দেখা যায় যে, হুসেন শাহ এবং নসরৎ শাহের রাজ্যের প্রত্যেক বিভাগীয় ব্যয়ের জন্য অথবা প্রত্যেক পদের জন্য একটি বিশেষ ভূখণ্ডের রাজস্ব নির্ধারিত ছিল রাজার ব্যক্তিগত ব্যয়ের জন্যও ভূমিরাজস্ব নির্ধারিত ছিল পরবর্তী মুঘলযুগেও এইরূপ প্রথা প্রবর্তিত হইয়াছিল প্রত্যেক রাজকুমার বা রাজকুমারীর ব্যক্তিগত ব্যয়ের জন্য নির্দিষ্ট ভূমিখণ্ডের স্বত্ব নির্দিষ্ট ছিল-এমন কি বিভিন্ন প্রকার ব্যয়ের জন্য বিভিন্ন পরগনার রাজস্ব নির্দিষ্ট ছিল

 

হুসেন শাহ নিষ্ঠাবান মুসলমান ছিলেন-তাঁহার রাজ্যের বিভিন্ন অংশে বহু নূতন মসজিদ নির্মিত হইয়াছিল বাংলায় আবিস্কৃত মসজিদের সমসাময়িক তালিকা হইতে অনুমান করা যায় যে, বিগত দুইশত বৎসরে বঙ্গদেশে যত মসজিদ নির্মিত হইয়াছিল তাহা অপেক্ষা অধিক সংখ্যক মসজিদ হুসেন শাহের ছাব্বিশ বৎসর রাজত্বকালে নির্মিত হইয়াছিল হুসেন শাহ মালদহে বিরাট মাদ্রাসা নির্মাণ করেন এবং পাণ্ডুয়াতে কুতুব-উল-আলমের সমাধিতে বহু সম্পত্তি ও অর্থ দান করেন এবং তথায় একটি মসজিদও নির্মাণ করেনতিনি প্রতি বৎসর একডালা হইতে পদব্রজে তীর্থদর্শন করিতেনবহু মসজিদ ও মাদ্রাসাতে তাঁহার দান ছিল হুসেন শাহ রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে কূপও নির্মান করিয়াছিলেন স্বর্গীয় রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁহার ‘বাংলার ইতিহাস’ গ্রন্থে (২য় খণ্ড-২৫৩-২৬১ পৃঃ) বঙ্গ, বিহার ও মগধের নানাস্থানে হুসেন শাহ কর্তৃক নির্মিত মসজিদ, মিনার, মাদ্রাসা ও কূপের বিশদ বিবরণ লিপিবদ্ধ করিয়াছেন৩৩ এই সকল মসজিদ, মিনার মাদ্রাসা হুসেন শাহের ইসলামে নিষ্ঠা ও স্থাপত্য-প্রীতির পরিচয় দেয় হুসেন শাহ ইসলামে বিশ্বাসী ছিলেন বলিয়া হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের প্রতি আনুষ্ঠানিকভাবে কোন অত্যাচার করেন নাই হিন্দুগণ হুসেন শাহকে ‘নৃপতি-তিলক’ বলিয়া সম্মান করিত

 

ছায়া শূন্য বেদ শশী পরিমিত শক

সনাতন হুসেন শাহ নৃপতি তিলক৩৪

 

তাঁহার শাসনে যে হিন্দুগণ অপেক্ষাকৃত নিরাপদ ছিল, তাহার প্রমান হিন্দুগণ হুসেন শাহকে কৃষ্ণের অবতার বলিয়া অভিনন্দিত করিয়াছে‘কৃষ্ণের অবতার’ বিশেষণের পশ্চাতে অত্যাচারীর অত্যাচার নিবারণের ইঙ্গিত আছেবোধ হয় তাঁহার পূর্বে হিন্দুগণ আরও অত্যাচারিত হইত এবং তাঁহার পূর্ববর্তী সুলতানগণ হিন্দুদের প্রতি এই অত্যাচার নিবারণের চেষ্টা করেন নাই কিন্তু হুসেন শাহ হিন্দুদিগকে এই অত্যাচার হইতে রক্ষা করিয়াছিলেন বলিয়া ‘কৃষ্ণের অবতার’ রূপে বিশেষিত হইয়াছিলেন

 

‘নৃপতি হুসেন শাহ হয় মহামতি

পঞ্চম গৌড়েতে যার পরম সুখ্যাতি

অস্ত্রশস্ত্রে সুপণ্ডিত মহিমা অপার

কলিকালে হবু যেন কৃষ্ণ অবতার৩৫

 

অবশ্য সমসাময়িক হিন্দুগ্রন্থে হুসেন শাহের সমকালে বা রাজত্বকালে কাজী ও মোল্লাদের অত্যাচারের বহু উল্লেখ পাওয়া যায় বৃন্দাবন দাস রচিত চৈতন্যভাগবতে উড়িষ্যার হিন্দুমন্দির ধ্বংসের সংবাদ পাওয়া যায় চৈতন্যাচরিতামৃতের নানাস্থানে কাজীর অত্যাচারের বর্ণনা আছে মাদ্‌লা পঞ্জিকায় পুরীধাম ধ্বংসের কথা আছে উড়িষ্যা ও কামরুপ অভিযানের সময় হিন্দুর উপর অত্যাচার দর্শনে রূপ ও সনাতনের মত প্রভুভক্ত এবং রাজভক্ত কর্মচারীও হুসেন শাহরে উপর বীতশ্রদ্ধ হইয়াছিলেন ইসমাইল গাজীর মুসলিম অধিনায়কতার মধ্যে তদানীন্তন মুসলিম মনোভাবের পরিচয় পাওয়া যায় হুসেন শাহ সনাতনের মনোভাব পরিবর্তনের অপরাধে তাঁহাকে কারারুদ্ধ করিয়াছিলেন কিন্তু তিনি কারাধ্যক্ষকে উৎকোচ প্রদানে বশীভূত করিয়া পলায়ন করেন এবং শ্রীচৈতন্যদেবের শরণাপন্ন হনরূপও রাজকার্য পরিত্যাগ করিয়া চলিয়া যান

 

হুসেন শাহ আরবি ও পারসিক সাহিত্যের সঙ্গে বাংলা সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতা করিয়াছিলেন তাঁহার রাজত্বকালে রচিত গ্রন্থাবলীর অধিকাংশই বিনষ্ট হইয়া গিয়াছে বিজয়গুপ্ত, মালাধর বসু, বিপ্রদাস ও যশোরাজ খান পরম শ্রদ্ধার তাহার নাম স্মরণ করিয়াছেন ফতেহাবাদ সরকারের অন্তর্ভুক্ত ফুল্লশ্রী গ্রাম নিবাসী বিজয় গুপ্ত ১৪০৬ শকে (১৪৮৪ খ্রিস্টাব্দে) মনসামঙ্গল রচনা করিয়াছিলেন হুসেন শাহের সেনাপতি পরাগল খানের পৃষ্ঠপোষকতায় কবীর পরমেশ্বর মহাভারতের আদিপর্ব হইতে স্ত্রীপর্ব বাংলা ভাষায় অনুবাদ করিয়াছিলেন

 

নৃপতি হুসেন শাহ গৌড়ের ঈশ্বর

ডান হক সেনাপতি হওন্ত লস্কর

লস্কর পরাগল খান মাহমতি

সুবর্ণ বসন পাইল অশ্ব বায়ুগতি

লস্করী বিষয় পাই আইবন্ত চলিয়া

চাটিগ্রামে চলি গেল হরষিত হৈয়া

পুত্র-পৌত্রে রাজ্য করে খান মহামতি

পুরাণ শুনন্ত নিতি হরষিত মতি৩৬

 

কুলীনগ্রাম-নিবাসী মালাধর বসু ১৩৯৫ শকে (১৪৭৩ খ্রিষ্টাব্দে) ভাগবতের দশম ও একাদশ স্কন্দ বাংলায় অনুবাদ আরম্ভ করেন এবং ১৪০২ শকে (১৪৮০ খ্রিস্টাব্দে) তাঁহার অনুবাদকার্য শেষ করেনএই সাহিত্য চর্চার জন্য হুসেন শাহ মালাধর বসুকে ‘গুণরাজ খান’ উপাধি প্রদান করিয়াছিলেন৩৭ মালাধর বসুর কাব্যের নাম ‘শ্রীকৃষ্ণ বিজয়’

১৪১৭ শকে (১৪৯৫ খ্রিস্টাব্দে) বিপ্রদাস নামক জনৈক ব্রাহ্মণ ‘মনসামঙ্গল’ নামে একটি কাব্য রচনা করেন তাঁহার গ্রন্থের পুস্পিকায় হুসেন শাহের নাম আছে

 

সিন্ধু ইন্দু বেদ মহি শক পরিমাণ

নৃপতি হুসেন সা গৌড়ে সুলক্ষণ

 

যশোরাজ খান রচিত একটি গীতে হুসেন শাহের নাম উল্লিখিত আছে-

 

শ্রীযুত হসন, জগতভূষণ,

সেই এহি রস জান!!৩৯

 

হুসেন শাহ মধ্যযুগীয় বঙ্গ নৃপতিদের মধ্যে সর্বশেষ্ঠ না হইলেও অন্যতম শ্রেষ্ঠ নরপতি-এবিষয়ে কোন সন্দেহ নাই কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় যে, আবুল ফজলের মত তাঁহার কোন কবিবন্ধু বা অমাত্য ছিলেন না-যিনি তাঁহার কীর্তিকাহিনীকে ইতিহাসের পৃষ্ঠায় অক্ষয় করিয়া রাখিতে পারিতেন হুসেন শাহ ‘বঙ্গের আকবর’ বলিয়া অভিনন্দিত হইবার মত যোগ্যতা ও গুণাবলীর অধিকারী হইলেও তাঁহার কৃতিত্ব ও গুণাবলীর কোন ধারাবাহিক লিপিবদ্ধ বিবরণ রচিত হয় নাই কিন্তু তথাপি অদ্যাপি হুসেন শাহের যশ উড়িষ্যা হইতে ব্রহ্মপুত্র পর্যন্ত বিস্তৃত রহিয়াছে

 

নসরৎ শাহ বা নসীব শাহ (১৫১৯-১৫৩২ খ্রিঃ)

 

হুসেন শাহের জীবদ্দশায় তাঁহার জ্যেষ্ঠপুত্র দানিয়েল আসাম যুদ্ধে নিহত হইয়াছিলেননসরৎ শাহ পিতা কর্তৃক সিংহাসনের উত্তরাধিকারী মনোনীত হইয়াছিলেন সুতরাং হুসেন শাহের মৃত্যুর পর নসরৎ শাহ ‘নাসিরউদ্দীন আবুল মুজাফর নসরৎ শাহ’ উপাধি গ্রহণ করিয়া সিংহাসনে আরোহণ করেন৪০ পিতার জীবিতকালে নসরৎ শাহ বিদ্রোহ করিয়াছিলেন, কিন্তু সিংহাসনে আরোহন করিয়া ভ্রাতৃহত্যা করেন নাই-যদিও মুসলমান  রাজত্বে ভ্রাতৃহত্যা একটা নিয়েম পর্যবসিত হইয়াছিল নসরাৎ শাহ ভ্রাতাদিগকে সম্মানিত রাজপদ প্রদান করিয়া তাঁহাদের বৃত্তির পরিমাণ বর্ধিত করিয়াছিলেনডঃ হবিবউল্লা বলেন যে, পিতার জীবিতকালে নসরাৎ খান যৌবরাজ্যে অভিষিক্ত হইয়া স্বীয় নামে মুদ্রা প্রচলন করেন অবশ্য এক বৎসরের একটি মুদ্রা ভিন্ন ইহার অন্য কোন সমর্থন নাই

 

নসরৎ শাহ পিতার সকল সদ্‌-গুণাবলীর অধিকারী হইয়াছিলেন আত্মীয়-পরিজনের প্রতিও তাঁহার যথেষ্ট স্নেহ-মমতা ছিল সুদীর্ঘকাল শাসনকার্যে এবং সামরিক অভিযানে লিপ্ত থাকায় তিনি  রাজনীতি সম্বন্ধে বহু প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান লাভ করেনতাহা ছাড়া তাহার নিজেরও গভীর রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ছিল

 

নসরৎ শাহের চৌদ্দ বৎসর রাজত্বকালকে দুইভাবে বিভক্ত করা যায়-প্রথম সাত বৎসর (১৫১৯-১৫২৫ খ্রিঃ) এবং পরবর্তী সাত বৎসর (১৫২৫-১৫৩২ খ্রিঃ)নসরৎ শাহের রাজত্বের প্রথমার্ধে বিশেষ কোন যুদ্ধবিগ্রহের সংবাদ পাওয়া যায় না দিল্লির লোদী বংশের সঙ্গে সন্ধির শর্ত কোনও পক্ষ হইতে ভঙ্গ হয় নাই সুতরাং সাহিত্য ও শিল্প সাধনায় বাঙালির অবসর নিয়োজিত হইয়াছিল

 

পিতা হুসেন শাহের রাজ্যশাসন-ব্যবস্থার সহিত নসরৎ শাহ সংযুক্ত ছিলেন সুতরাং পিতার দৃষ্টান্ত অনুকরণে তিনি রাজ্যের সীমান্ত রক্ষার ব্যবস্থা করিয়াছিলেন এবং পূর্বাঞ্চলের নেতৃত্ব গ্রহণের জন্য উৎসুক ছিলেন

 

নসরৎ শাহের রাজ্যারম্ভের তিন বৎসরের মধ্যে (১৫২২ খ্রিঃ) বিহারের লোদী শাসনকর্তা দরিয়া খান লোহানী দিল্লির বিরুদ্ধে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন দরিয়া খান লোহানীর রাজ্যসীমা পাটনা হইতে জৌনপুর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল হুসেন শাহের সময়ে জৌনপুরের শার্কী বংশের সঙ্গে বন্ধুত্ব বাংলার পররাষ্ট্রনীতির প্রধান অঙ্গ ছিল সিকান্দর লোদীর সময়ে দিল্লির আক্রমণে শার্কী রাজ্য নষ্ট হইয়া গেলে হুসেন শাহ বাধ্য হইয়া লোদী রাজবংশের সঙ্গে পরস্পর যুদ্ধ বিরতি চুক্তি স্বাক্ষর করিয়াছিলেন দরিযা খান লোহনীকে সিকান্দর বিহারের শাসনকর্তা নিযুক্ত করিয়াছিলেন দরিয়া খান লোহানী (১৫২২ খ্রিঃ) স্বাধীনতা ঘোষণা করিলে নসরৎ শাহ অনেকখানি নিরুদ্ধেগ হইলেন দরিয়া খান লোহানীর দৃষ্টি ছিল পশ্চিমাভিমুখী; সুতরাং নসরাৎ শাহ তাঁহার সহিত বন্ধুত্ব স্থাপন করিলেন৪১ শোন নদীর উত্তরাঞ্চল পর্যন্ত বঙ্গের সীমানা বিস্তৃত হইল নসরাৎ শাহ ত্রিহুত ও জয় করিলেন এবং তাঁহার শ্যালক মকদুম-ই-আলমকে এই অঞ্চলের শাসনকর্তা নিযুক্ত করিলেন৪২ মকদুম-ই-আলম গঙ্গা-গণ্ডক নদীর সঙ্গমস্থল হাজীপুরে একটি দুর্গ নির্মাণ করিয়া পশ্চিমদিক হইতে বাংলা আক্রমণের পথ নিঙ্কণ্টক করিলেন হাজীপুরের ভৌগোলিক গুরুত্ব ছিল এবং হাজীপুর নদীপথে বিহারে প্রবেশের সকল পথগুলি নিয়ন্ত্রিত করিত হাজীপুরে অবস্থানহেতু মকদুম-ই-আলম গোগরা নদীর উভয় তীরে সরণ ও আজমগড় পর্যন্ত নিয়ন্ত্রিত করিতে লাগিলেন৪৩

 

এই সমেয় দিল্লির লোদী সাম্রাজ্য ক্রমশ ধ্বংসের পথে অগ্রসর হইতেছিল পূর্বদিকে লোহানীরাজ্য স্থাপন, পশ্চিমদিক দৌলত খান লোদীর বিদ্রোহ, ১৫২২-১৫২৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত কাবুলাধিপতি চাঘতাই মুঘল সন্তান বাবরের বারংবার আক্রমণে লোদীরাজ্য ধ্বংসায়মানবাবর পানিপথ এবং ফতেপুর সিক্রিয় যুদ্ধে বিজয়ী হইলেননসরৎ শাহ মুঘল অগ্রগতি প্রতিরোধের জন্য বিহারের সীমান্তে শিবির সংস্থাপনের আয়োজন করিলেন বাবর-পুত্র হুমায়নি মুঘল বিজয়বাহিনী লইয়া জৌনপুর আক্রমণের জন্য উৎসুকমা’রুক খান এবং নাসির খান লোহানী কনৌজ ও জৌনপুর হইতে বিতাড়িত হইলেনবাবর গঙ্গাতীর হইতে গোগরা নদীর উত্তরাংশ পর্যন্ত অধিকার করিলেন (আগস্ট, ১৫২৬ খ্রিঃ)৪৪

 

বাবর গৌড়বঙ্গের অধিপতি নসরৎ শাহের নিকট মহজব নামক একজন দূত প্রেরণ করিয়া বশ্যতা দাবি করিলেন নসরাৎ শাহ এক বৎসরকাল পর্যন্ত মুঘলনীতির বিষয়ে কোন স্থির সিদ্ধান্তে উপনীত হইতে পারেন নাই এবং নিরপেক্ষতা নীতিই তিনি গ্রহণ করিয়াছিলেনকারণ, তিনি আগফান সর্দারদের অনিশ্চিত সাহায্যের উপর সম্পূর্ণ নির্ভর করা যুক্তিযুক্ত বিবেচনা করেন নাই এবং মুঘলশক্তির পূর্ণরূপও তখন প্রকাশ পায় নাই কিন্তু মোল্লা মহজবের প্রত্যাবর্তনে অত্যধিক বিলম্ব দেখিয়া বাবরের সন্দেহ উপস্থিত হইল; তিনি বাংলা আক্রমণের উদ্যোগ করিলেনএই সংবাদ পাইয়া নসরৎ শাহ মোল্লা মহজবের সঙ্গে ইসমালকে বহু উপটৌকনসহ বাবরের নিকট প্রেরণ করিলেন এবং আনুগ্যতা স্বীকার প্রতিশ্রুতি প্রদান করিলেনবাবর সনু্তুষ্ট হইয়া বঙ্গদেশ আক্রমণ না করার সিদ্ধান্ত করিলেন

 

নসরৎ শাহ কৌশলে তাঁহার মনোভাবা গোপন করিলেন মাত্র কিন্তু দুর্ধর্ষ আফগান বীর মুহম্মদ ফারমুলী, বাহার খান লোহানী প্রভৃতি আফগান নায়কগণ নবাগত মুঘল প্রতিপত্তি স্বচ্ছন্দমনে গ্রহণ করেন নাই তাঁহারা নসরাৎ শাহের প্রত্যক্ষ সাহায্যের প্রতিশ্রুতি না পাইয়াও বাবরের বিরোধিতা করিলেনএই সময়ে (১৫২৯ খ্রিঃ) বিহারে শাসনকর্তা বাহার লোহানীর মৃত্যুতে আফগান-বিরোধিতার ভিত্তি শিখিল হইয়া গেল অন্যদিকে সাসারামের জায়গিরদার হাসান শূরের পুত্র শের খান শূর বাবরের আনুগত্য স্বীকার করিয়া দক্ষিণ-বিহারে জায়গির গ্রহণ করিলেন জৌনপুরের সুলতান জামাল খানও তখন শের খানের পৃষ্ঠপোষক বিহারের শাসনভার বাহার খান লোহানীর শিশুপুত্র জালাল খান লোহানীর হস্তে ন্যস্ত হইয়াছিলশিশু জালাল খানের পক্ষে বাবরের বিরোধিতার নায়কত্ব করপ সম্ভবপর ছিল না, সুতরাং সে দায়িত্ব আসিয়া পড়িল নসরৎ শাহের উপর; কিন্তু মুঘলের সহিত বন্ধুত্বের মুখোশও তিনি পরিত্যাগ করিতে পারেন না

 

পূর্বাঞ্চলের নায়কত্ব লইয়া বিভিন্ন আগফান সর্দারের মধ্যে বিরোধ আরম্ভ হইল মুহম্মদ শাহ ফারমুলী, জালাল খান লোহানী, শের খান শূর, নসরৎ শাহ প্রভৃতি নায়কগণ তখনও সর্বসম্মতিক্রমে একজন অধিনায়কের অধীনে মুঘলশক্তির অগ্রগতি প্রতিরোধের ব্যবস্থা করিয়া উঠিতে পারেন নাইএই সময়ে ইব্রাহিম লোদীর ভ্রাতা মামুদ লোদীর আগমনে পূর্বাঞ্চলে নূতন পরিস্থিতির উদ্ভব হইল মামুদ লোদীর বংশ মর্যাদার আকৃষ্ট হইয়া তাঁহার নেতৃত্ব বহু আফগান বাবরের বিরুদ্ধে একত্রিত হইল বিহার-সুলতান জালাল খানের দুর্বলতার সুযোগে মামুদ লোদী বিহারের একাংশে আধিপত্য বিস্তার করিলেন লোহানী সর্দারগণ মামুদের এই আচরণে অসন্তুষ্ট হইলেন জালাল তাঁহার অনুচরবর্গসহ পিতৃবন্ধু নসরৎ শাহের আশ্রয় গ্রহণ করিয়া সাহায্য প্রার্থনা করিলেনশিশু জালাল খান লোহানী হাজীপুরে মকদুম-ই-আলমের নিকট অবস্থান করিতে লাগিলেন এইবার মুঘল প্রতিরোধের মেরদণ্ড হইলেন নসরৎ শাহ

 

মামুদ লোদীর সঙ্গে নসরৎ শাহ, শের খান, সর্দার বিওয়ান খান, বায়াজিদ খান, কুতুব খান, হিন্দু জমিদার বসন্ত রায় বাবরের বিরুদ্ধে যোগ দিলেন১৫২৯ খ্রিষ্টাব্দের প্রথম দিকে মহা উৎসাহে সৈন্য চলাচল আরম্ভ হইল গঙ্গা নদীর উভয় তীর অনুসরণ করিয়া মামুদ লোদী এবং শের খান চুনার হইতে বারাণসী অভিমুখে সৈন্য পরিচালনা করিলেন বিওয়ান ও বায়াজিদ গোগরা অতিক্রম করিয়া গোরক্ষপুর অভিমুখে অগ্রসর হইলেন৪৫ নসরৎ শাহের আদেশে গৌড়ীয় সেনাপতি কুতুব খান বাহরাইচ অভিমুখে অগ্রসর হইয়াছিলেন-উদ্দেশ্য লক্ষ্মৌ অধিকার৪৬ বাবরও সসৈন্যে বিহার অভিমুখে অগ্রসর হইলেন

 

কিন্তু দুইমাসের মধ্যেই মামুদ লোদীর অকর্মণ্যতা এবং চরিত্রের শ্লথতায় সকলে বিরক্ত হইয়া উঠিল মামুদ লোদী বাবরের আগমণের সংবাদ পাইয়া যুদ্ধ না করিয়াই মাহোবার দিকে পলায়ন করিলেন৪৭ - বিরোধীদলের ঐক্য নষ্ট হইয়া গেল শেরখান বারাণসী অধিকার করিলেও একমাসের মধ্যেই বাবরের বশ্যতা স্বীকার করিলেন জালাল খান লোহানীও বকসারের নিকট বাবরের বশ্যতা স্বীকার করিলেন বাবর তীরভুক্তি অধিকার করিয়া গঙ্গা ও গণ্ডকীর সঙ্গমস্থলে বিওয়ান এবং বায়াজিদের অধীন আফগানদিগকে পরাজিত করিলেন৪৯ অতঃপর বাবর বঙ্গ অভিমুখে যাত্রা করিলেন

 

নসরৎ শাহের সহকর্মী বন্ধুগণ ক্রমান্বয়ে সকলেই মুঘলের বশ্যতা স্বীকার করিলেন-১৫২৯ খ্রিস্টাব্দে এপ্রিল মাসের বাবার তাঁহার বকসারের শিবির হইতে সনরৎ শাহের দূত ইসমাইলের সঙ্গে আর একজন দূত প্রেরণ করিয়া নসরৎ শাহের সৈন্যবাহিনীকে গোগরা নদীর তীর ত্যাগের আদেশ দিলেন যুদ্ধ করা ব্যতীত নসরৎ শাহের আর কোন উপায় ছিল না; তথাপি নসরৎ শাহ উত্তর প্রদানে বিলম্ব করিতে লাগিলেন উদ্দেশ্য-বিওয়ান এবং বায়াজিদের বাহিনীকে গোগরা তীরে উপস্থিতির সময় দান ইতোমধ্যে তিনি মকদুমকে গোগরা গঙ্গার সঙ্গমস্থলে সৈন্যবানিহী সমাবেশ করিতে নির্দেশ দিলেনবাবর একমাসকার নসরৎ শাহের উত্তরের জন্য অপেক্ষা করিলেন, অবশেষে তিনি গোগরা নদীর তীর হইতে বঙ্গসৈন্যের অপসারন দাবি করিয়া ইসমাইল মিতা নামক আর একজন দূত প্রেরণ করিলেন যুদ্ধ অনিবার্য হইয়া উঠিলতিন দিবসব্যাপী যুদ্ধ চলিল-বাঙালি পদাতিক, অশ্বারোহী ও নৌবাহিনী যথেস্ট বীরত্ব প্রদর্শন করিয়াও মুঘল রণকৌশলের নিকট পরাজয় স্বীকার করিতে বাধ্য হইলবীর বসন্ত রায় এই যুদ্ধে নিহত হইলেন৫০ জালাল খান লোহানী স্বয়ং বাবরের সম্মুখে উপস্থিত হইয়া কর প্রদানের শর্তে বিহারে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হইলেন; শের শাহ বাবরের বশ্যতা স্বীকার করিলেন; নসরৎ শাহের সৈন্যদল গোগরা নদীর তীর পরিত্যাগ করিল-গণ্ডক নদীর পশ্চিম তীরবর্তী অঞ্চল মুঘল অধীনে চলিয়া গেল স্থির হইল, বঙ্গের সুলতান মামুদ লোদীকে কোনপ্রকার সহায়তা করিবেন না৫১ নসরৎ শাহের কূটবুদ্ধির ফলে মুঘল সৈন্য বঙ্গের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে নাই১৫৩০ খ্রিস্টাব্দে বাবরের মৃত্যু হইল-নসরৎ শাহ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলিলেন

 

১৫৩০ খ্রিস্টাব্দে বাবরের মৃত্যুর পর হুমায়ুন দিল্লির সিংহাসনে আরোহণ করিলে মামুদ লোদী পুনরায় মুঘল সৈন্যের বিরুদ্ধে সৈন্য সমাবেশ করিতে আরম্ভ করিলেন বিওয়ান খান, বায়াজিদ খান এবং শের খান একযোগে জৌনপুর হইতে মুঘলসৈন্য বিতাড়িত করিলেন লক্ষ্মৌ আক্রান্ত হইলনসরৎ এই অভিযানে কতখানি অংশগ্রহণ করিয়াছিলেন সে সম্বন্ধে কোনও সঠিক বিবরণ জানা যায় নাতবে মামুদ লোদী বঙ্গদেশ হইতে প্রচুর সাহায্য লাভ করিয়াছিলেন-এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নাই হুমায়ুনের সহিত মামুদ লোদীর দাদরা নামক স্থানে যুদ্ধ হইলএই যুদ্ধে বিওয়ান খান এবং বায়াজিদ খান নিহত হইলেন শেরখান ব্যাপার গুরুতর বুঝিয়া হুমায়ুনের বশ্যতা স্বীকার করিয়া দিল্লির অধীনে চুনারে জায়গির গ্রহণ করিলেন মামুদ লোদী পরাজিত হইয়া রাজ্যত্যাগ করেন এবং অবশেষে পাটনায় আশ্রয় গ্রহণ করেনতথায় ৯৪৯/১৫৪২ খ্রিস্টাব্দে তাঁহার মৃত্যু হয়৫২ হুমায়ুন তখন বঙ্গদেশ আক্রমণের উদ্যোগ করিলেন

 

নসরৎ শাহ গত্যন্তর না দেখিয়া হুমায়ুনের শত্রু গুজরাটের সুলতান বাহাদুর শাহের সহিত মিত্রতা স্থাপনের জন্য খোজা মালিক মরজানকে প্রেরণ করিলেন বাহাদুর হুমায়ুনের বিরুদ্ধে যুদ্ধের আয়োজন করিলেন হুমায়ুন এই সংবাদ পাইয়া বঙ্গের বিরুদ্ধে অভিযান না করিয়া গুজরাট অভিমুখে যাত্রা করিলেননসরৎ শাহের এই কূটনীতি সাময়িকভাবে বাংলাকে যুদ্ধের আবর্ত হইতে রক্ষা করিল, কিন্তু নসরৎ শাহের আকস্মিক মৃত্যুতে বাংলা-গুজরাটের মৈত্রী প্রস্তাব পরিপূর্ণরূপে হইতে পারিল না

 

আহোম যুদ্ধ

 

নসরৎ শাহ বাংলাদেশকে স্বস্তি দিতে ইচ্ছা করিলেও ঘটনাচক্রে বঙ্গদেশ সম্পূর্ণভাবে শান্তি উপভোগ করিতে পারে নাই১৫২৯ খ্রিস্টাব্দে বাবরের সহিত সন্ধি হইলেও ঐ বৎসর হইতেই আহোমগণের সহিত দীর্ঘস্থায়ী সংগ্রাম আরম্ভ হইল আহোমগণ হুসেন শাহের আক্রমণের ক্ষতচিহ্ন বিস্মৃত হয় নাইআহোম রাজ্যের সীমান্তবর্তী স্থানে মুসলিম ও আহোম জাতির যুদ্ধ সংক্রামক ব্যাধিতে পরিণত হইয়াছিলআসাম বুরুঞ্জী অনুসারে প্রায় প্রতি বৎসরই মুসলিমদের সহিত যুদ্ধের উল্লেখ পাওয়া যায়তবে সংবাদগুলি ধারাবাহিক নহে-অনেক সময়ে বৃহৎ ঘটনার উল্লেখ ইঙ্গিত মাত্রেই শেষ হইয়াছে-কখনও সামান্য ঘটনার সংবাদ অত্যন্ত দীর্ঘ করা হইয়াছে ঘটনার কাল ও পারস্পর্য অনেক স্থানে অসংলগ্ন-মুসলিম ইতিহাসকারগণ নিজেদের পরাজয়ের সংবাদ দিতে কার্পণ্য করিয়াছেন

 

১৫২৯ খ্রিস্টাব্দে যখন নসরৎ শাহ ও বাবরের বিরোধ চরমে উঠিয়াছিল, তখন অকস্মৎ অহোমরাজ সুহুঙ্গ-মুঙ্গ ব্রহ্মপুত্র নদ অতিক্রম করিয়া মুসলিম অধিকৃত হাজো অভিমুখে অগ্রসর হইলেনকোন সংঘর্ষের সংবাদ জানা যায় না আহোমগণ কর্তৃক ব্রহ্মপুত্রের উত্তর তীরে নারায়ণপুরে একটি সেনানিবাস স্থাপিত হইয়াছিল-উদ্দেশ্য মুসলিম নগরী হাজো আক্রমণদুই বৎসর পরে মুসলিমগণ পদাতিক, অশ্বারোহী ও নৌবাহিনীসহ দারাঙ অঞ্চলের আহোমরাজ্য আক্রমণ করিল (১৫৩১ খ্রিঃ) তেমানী বা ত্রিমোহনীর জলযুদ্ধে বাংলার মুসলিম সেনাবাহিনী পরাজিত হইয়া কামরুপে আশ্রয় গ্রহণ করিলআহোম নরপতি সুহুঙ্গ-মুঙ্গ ভবিষ্যতে মুসলিম আক্রমণ প্রতিহত করিবার জন্য ব্রহ্মপুত্রের উত্তরে সলায় ও দক্ষিণে সিংগিরিতে দুইট দুর্গ নির্মাণ করিলেনসেই বৎসরই মুসলিম সেনাপতি বিটমারিক বা মিত মালিকের অধীনে সুলতানের সৈন্য সিংগিরির আহোম দুর্গ আক্রমণ করিলআহোম সেনাপতি বরপাত্র গোগাই বিটমালিককে নিহত করেন; মুসলিম সেনাবাহিনীকে খাগারিজান (নওগাঁ) পর্যন্ত বিতাড়িত করেন৫৩

 

ক্রমাগত পরাজয় ও বিফলতায় নসরৎ শাহের মেজাজ রুক্ষ হইয়া উঠিলসলিম গোলাম হোসেন বলেন-“শেষ বয়সে তাঁহার চরিত্রে নানা প্রকার দোষ সংক্রমিত হইল” একদা নসরৎ শাহ গৌড়ের অপরপ্রান্তে পিতা হুসেন শাহের সমাধি দর্শনে গিয়াছিলেনপথে তাঁহার সহচর একজন খোজাকে অন্যায় ব্যবহারের জন্য শান্তি প্রদান করেন খোজার অপরাধ সঠিক জানা যায় নাএই শাস্তিতে খোজা সম্প্রদায় অত্যন্ত ক্ষুব্ধ ও অপমানিত বোধ করিল প্রাসাদে প্রত্যাবর্তন করিলে ঐ খোজার প্ররোচনায় অন্যান্য খোজাগণ নসরৎ শাহকে হত্যা করিয়া অপমানের প্রতিশোধ গ্রহণ করিল রিয়াজ-উস-সালাতীন অনুসারে নসরৎ শাহ ষোড়শ বর্ষ রাজত্ব করিয়াছিলেন ৯৪৩/১৫৩২ খ্রিস্টাব্দে তাঁহার মৃত্যু হইয়াছিল৫৪

 

নসরৎ শাহের চরিত্র ও কৃতিত্ব

 

নসরৎ শাহ যৌবনে পিতার সহকর্মী ছিলেন বোধহয় সিংহাসন লাভের আকাঙ্খায় তিনি পিতার বিরুদ্ধাচরণ করিয়া স্বাধীনতা ঘোষণা করেন ফতেয়াবাদ হইতে তিনি নিজ নামে মুদ্রা প্রচলন করেনপরে পিতার সঙ্গে তাঁহার মিলন হয় সিংহাসনে আরোহণ করিয়া তিনি ভ্রাতৃহত্যা করেন নাই

 

পিতার অনুকরণে নসরৎ শাহ পররাষ্ট্র ব্যাপারে বিশেষ উৎসাহী ছিলেন তাঁহার উদ্দেশ্য ছিল পূর্ব ভারতে মুসলিম রাষ্ট্রগুলির মধ্যে প্রাধান্য লাভ এবং মুঘল রাজ্যবিস্তারের প্রচেষ্টার প্রতিরোধ করা কিন্তু পিতার মত সফলকাম তিনি হইতে পারেন নাই জীবনের শেষ ছয় বৎসর (১৫২৬-১৫৩২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত) তাঁহার বিশেষ কর্মব্যস্ততার মধ্যে অতিবাহিত হইয়াছিললোদী রাজত্বের অবসানে এবং মুঘল আগমনে বাংলাদেশে একটি জটিল সমস্যার উদ্ভব হইল মামুদ লোদীর অকর্মণ্যতা, আফগান সর্দারদের অস্থিরবুদ্ধি ও শের খানের কূট স্বার্থবুদ্ধি বাংলার সুলতানকে বিব্রত করিয়াছিলতবু তাঁহার কূটবুদ্ধি দ্বারা বাংলাদেশ উপকৃত হইয়াছিলআহোম যুদ্ধের জন্য তাঁহার বিশেষ দায়িত্ব ছিল না বঙ্গ-আহোম সংঘাত বহুকাল-পুঞ্জীভূত বিরোধের ফল জীবনের শেষ সময়ে নসরাৎ শাহের বুদ্ধিবৃত্তি ও কর্মক্ষমতা হ্রাস পাইয়াছিল

 

নসরৎ খানের নানা দোষ সত্ত্বেও তিনি বাংলার সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি বিরূপ ছিলেন না তাঁহার রাজত্বকালে পরাগল খানের পুত্র ছুটী খানের আদেশে শ্রীকর নন্দী মহাভারতের অশ্বমেধ পর্বের বাংলা অনুবাদ করিয়াছিলেন৫৫ নসরৎ খানের আদেশে কবীন্দ্র পরমেশ্বর মহাভারতের কিয়দংশ বাংলায় অনুবাদ করিয়াছিলেন কবীন্দ্র পরমেশ্বরের মহাভারতে উল্লেখ আছে-

নসরত খান

রচাইল পঞ্চালী যে গুণের নিদান৫৬

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গ্রন্থাগারও প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিলনসরৎ শাহের নিজস্ব গ্রন্থাগার ছিল ফতেয়াবাদে

 

নসরৎ শাহ স্থাপত্য নির্মাণে বিশেষ উৎসাহী ছিলেন নাসিরউদ্দীন নসরৎ শাহের রাজত্বকালের বহু শিলালিপি আবিস্কৃত হইয়াছে গৌড়ের অন্যতম প্রধান তোরণ ‘দাখিল দরওয়াজা’র সন্নিকটে আবিস্কৃত শিলালিপি হইতে জানা যায় যে, তিনিও একটি তোরণ নির্মাণ করাইয়াছিলেন (৯১৬/১৫১৯-২০ খ্রিঃ)৫৭ ৯৩১/১৫২৬ খ্রিস্টাব্দে গৌড়ে নসরৎ শাহ কর্তৃক শেখ আখি সিরাজ উদ্দীনের সমাধি-তোরণ নির্মিত হইয়াছিল ৯৩২/১৫২৬ খ্রিস্টাব্দে নসরৎ শাহ গৌড়ের গৌড়ের প্রসিদ্ধ বারদুয়ারী বা সোনা মসজিদ নির্মাণ করাইয়াছিলেন৫৯ মহম্মদের পদচিহ্ন রক্ষার জন্য তিনি গৌড়ের প্রসিদ্ধ কদম রসুল মসজিদের বেদী নির্মাণ করাইয়াছিলেন (৯৩৭/১৫৩০ খ্রিঃ)৬০ নসরৎ শাহ একলক্ষ মুদ্রা ব্যয়ে গৌড়ের নিকটে পিতার সমাধি নির্মাণ করেনএই স্থানটি এক-লাখা নামে এবং সমাধিটি বাদশহা কা মজাব বা কবর নামে পরিচিত হয়ইহার প্রবেশদ্বার প্রস্তর নির্মিত এবং প্রাচীর নীল ও শ্বেত ‘চীনা টালি’ দ্বারা আচ্ছাদিত ছিল চারিকোণে চারিটি মিনার ছিল; প্রতিটি মিনারে প্রস্তরখচিত পদ্ম ছিল সমাধিক্ষেত্রে হুসেন শাহ ও তাঁহার পরিবারের অনেক মৃত সন্তান শায়িত ছিলনসরৎ শাহ দেশের নানাস্থানে কূপ খনন করিয়া জলের ব্যবস্থা করিয়াছিলেন; মালদহে আবিস্কৃত শিলালিপিতে তাহার প্রমাণ পাওয়া যায়নসরৎ শাহ ব্যতীত অন্যান্য আমীর-ওমরাহগণও তোরণ ও কূপ নির্মাণ করিয়াছিলেন

 

আলাউদ্দীন ফিরুজ শাহ (১৫৩২-১৫৩৩ খ্রিঃ)

 

নসরৎ শাহের মৃত্যুর পর আবার বাংলার সিংহাসন লইয়া রক্তস্রোত বহিয়া গেল ৯৩৩/১৫২৬ খ্রিস্টাব্দে মুদ্রিত আবদুল বদরের মুদ্রা আবিস্কৃত হইয়াছে তাহাতে অনুমান করা যায় যে, নসরৎ শাহের জীবিতকালেই তাঁহার ভ্রাতা আবদুল বদর স্বাধীনতা ঘোষণা করিয়াছিলেন কিন্তু আবদুল বদরের চেষ্টা ফলবর্তী হয় নাইনসরৎ শাহের মৃত্যুর পর তাঁহার পুত্র আলাউদ্দীন ফিরুজ সিংহাসনে আরোহণ করেন আলাউদ্দীনকে দরবারের যে সমস্ত সম্ভ্রান্ত আমীর সহায়তা করিয়াছিলেন, তাঁহাদের মধ্যে বিহারের অন্তর্গত হাজীপুরের শাসনকর্তা মকদুম-ই-আলমের নাম বিশেষ উল্লেখযোগ্য রিয়াজ-উস-সালাতীন অনুসারে আলাউদ্দীন ফিরুজ শাহ মাত্র তিন মাস রাজ্যভোগ করিয়াছিলেন৬১ আলাউদ্দীন হুসেন শাহের অপর পুত্র গিয়াসউদ্দীন মামুদ ভ্রাতুস্পুত্রকে হত্যা করিয়া গৌড়ের সিংহাসন অধিকার করিয়াছিলেন আলাউদ্দীনের স্বল্প পরিসর রাজত্বের দুইটিমাত্র নির্দশন পাওয়া যায় আলাউদ্দীন ফিরুজ শাহের নামাঙ্কত কতিপয় রজতমুদ্রা আবিস্কৃত হইয়াছে-এই সমস্ত মুদ্রা ৯৩৯/১৫৩৬ খ্রিস্টাব্দে মুদ্রিত হইয়াছিল৬২ শ্রীধর কর্তৃক রচিত বিদ্যাসুন্দর উপাখ্যানেও আলাউদ্দীন ফিরুজ শাহের নাম উল্লিখিত হইয়াছে যৌবনে আলাউদ্দীন বাংলা ভাষায় যথেস্ট উৎসাহী ছিলেন বিদ্যাসুন্দরের রচয়িতা আলাউদ্দীন ফিরুজের প্রশস্তি লিপিবদ্ধ করিয়াছিলেন

 

গিয়াসউদ্দীন মামুদ শাহ (১৫৩৩-১৫৩৮ খ্রিঃ)

 

ভ্রাতুস্পুত্রের রক্তে রঞ্জিত হস্তে আবদুল বদর রাজদণ্ড গ্রহণ করিলেন-তাঁহার রাজউপাধি হইল ‘গিয়াসউদ্দীন মামুদ শাহ’ কিন্তু হাজীপুরের মকদুম-ই-আলম ছিলেন প্রভূত ক্ষমতার অধিকারী-তিনি মামুদ শাহের প্রভুত্ব স্বীকার করিলেন না ফিরুজ শাহের মৃত্যুর প্রতিশোধ গ্রহণের উদ্দেশ্যে তিনি বিদ্রোহ ঘোষণা করিলেন৬৩ তাঁহার সঙ্গে যোগ দিলেন বিহারের নায়েব মালিক বা সহকারী শাসনকর্তা বাংলার দুর্ভাগ্যের পুনরাবর্তন আরম্ভ হইল

 

গিয়াসউদ্দীন মামুদ শাহের স্বল্প পরিসর শাসনকাল (পাঁচ বৎসর-১৫৩৮ খ্রিঃ) ভারতবর্ষের-তথা বাংলার ভাগ্য পরিবর্তনের যুগ তাঁহার রাজত্বে ভারতের রঙ্গমঞ্চে বহু সংঘটিত হইলএই নাটকের নায়ক হইতেছেন-

 

দিল্লির সিংহাসনে হুমায়ুন-মুঘলরাজত্বের প্রারম্ভ যুগ

বাংলার সিংহাসনে গিয়াসউদ্দীন মামুদ শাহ-অধঃপতনের যুগ

বিহারের সিংহাসনে জালাল লোহানী-শিশু নায়কত্বের দুর্বলতা

সাসারামের জায়গিরদার শেষ খান-আফগান বংশের পুনরুত্থানের যুগ

গুজরাটের সিংহাসনে বাহাদুর শাহ-নিরপেক্ষ দর্শক

 

এই উত্থান-পতনের জটিল আবর্তনে বিহারের লোহানীবংশ, বাংলার হুসেন শাহী বংশ, দিল্লির চাঘতাই বংশ চলচ্চিত্রের ছবির মতন ভারতের রঙ্গমঞ্চে অভিনয় করিল-আফগান শক্তির পুনঃপ্রতিষ্ঠা হইল-সুদূর পূর্বভারতীয় আফগান নায়ক সমস্ত উত্তর ভারত জয় করিলেন, দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হইল পশ্চিমে বাহাদুর শাহ ছিলেন এই রাষ্ট্রলীলার সাক্ষী স্বরূপ বাংলার ঘটনাবর্তে তিনি সাময়িকভাবে জড়িত হইয়াছিলেন মাত্র

 

গিয়াসউদ্দীন মামুদ শাহ-ই এই রাষ্ট্রলীলা নাটকের সূত্রধর ছিলেন কিন্তু এই রাষ্ট্রলীলার জটিল গ্রন্থি ও গতি নিরীক্ষণ ও পরিচালনা করিবার মত সূক্ষ্মবুদ্ধি তাঁহার ছিল না সুতরাং কোন অভিজ্ঞতাকে কোন দৃশ্যে নিয়োজিত করিতে হইবে তাহা সম্যক উপলব্ধি করিতে পারেন নাই-সম্ভাব্য শত্রু ও মিত্রের গুরুত্ব ও ক্ষেত্র নির্ণয় করিতে পারেন নাই

 

বিদেশাগত মুঘল বিজেতাকে ভারতবাসী হিন্দু-মুসলমান কেহই যে প্রীতির চক্ষে দেখিতে পারে নাই-তাহা গিয়াসউদ্দীন মামুদ শাহ বুঝিতে পারেন নাই লোহানী বংশ এবং শেরখান হুমায়ুনের বশ্যতা স্বীকার করিলেও যে মনে প্রাণে মুঘলদের বিরুদ্ধাচারী ছিলেন, তাহা বুঝিবার মত সূক্ষ্মদৃষ্টি তাঁহার ছিল না সুদূর গুজরাটের বাহাদুর শাহের সঙ্গে নসরৎ শাহের সখ্য স্থাপনের প্রয়াস যে কত দূরদৃষ্টির পরিচায়ক সে দিক দিয়া তিনি চিন্তাই করেন নাই সমস্ত ঘটনাগুলিকে সামগ্রিকভাবে বিবেচনা না করিয়া গিয়াসউদ্দীন মামুদ শাহ জালাল খান লোহানীর সঙ্গে মৈত্রী স্থাপন করিয়া আপাত শত্রু হাজীপুরের শাসনকর্তা মকদুম-ই-আলমের বিরুদ্ধে অভিযানই তাঁহার রাষ্ট্রনীতির মূল লক্ষ্য ছিলশের খানকে নিয়ে মুঘলদের বিরুদ্ধে যে একটি সমবেত প্রচেষ্টা সম্ভব, তাহা গিয়াসউদ্দীন অনুধাবন করিতে পারেন নাইবরং তিনি শের খানকেই শত্রু বিবেচনা করিলেন লোহানীর সঙ্গে বন্ধুত্ব করিয়া তিনি একটিমাত্র লোষ্ট্র নিক্ষেপে দুই শত্রু- মকদুম ও শেরখানকে আঘাত করিবার চেষ্টা করিলেন

 

প্রথমেই ১৫৩৩ খ্রিস্টাব্দে গিয়াসউদ্দীন মুঙ্গেরের শাসনকর্তা কতুবখানকে মকদুম-ই-আলমের বিরুদ্ধে প্রেরণ করিলেন৬৪ মকদুম ছিলেন শের খানের মিত্র; সুতরাং মকদুমের পরাজয়ে শের খানের পরাজয় হইবে বলিয়া গিয়াসউদ্দীন ধারণা করিয়াছিনে জালাল খান লোহানীরও এই অভিযানে সমর্থন ছিলফলে পূর্বাঞ্চলে দুইটি দল সৃষ্টি হইল-একদিকে গিয়াসউদ্দীন ও জালাল খান এবং অন্যদিকে মকদুম ও শের খান আব্বাস খান সরওয়ানী রচিত তারিখ-ই-শেরশাহী অনুসারে শের খান দিল্লি হইতে পলায়ন করিয়া বিহারে প্রত্যাবর্তন করিলে গৌড়রাজের অধীনস্থ কর্মচারী হাজীপুরের সরলস্কর বা শাসনকর্তা মকদুমের সহিত তাঁহার বন্ধুত্ব হইয়াছিল৬৫ তারিখ-ই-শেরশাহী অনুসারে মামুদ শাহ বিহার বা মগধ প্রদেশ আফগানদের নিকট হইতে জয় করিবার উদ্যোগ করিয়াছিলেন৬৬ রিয়াজ-উস-সালাতীন ও তারিখ-ই-শেরশাহী অনুসারে শের খান মামুদ শাহের সহিত মকদুম-ই-আলমের সন্ধি স্থাপনের চেষ্টা করিয়াছিলেন৬৭ হুমায়ুনের পক্ষে এই দুইটি দলের দৃষ্টি শুভ হইয়াছিল দূরদর্শী শের খান গিয়াসউদ্দীন মামুদকে মকদুমের বিরুদ্ধাচরণ করিতে নিষেধ করিয়াছিলেন-কিন্তু মামুদ কুতুব খানের সৈন্যকে হাজীপুরে আক্রমণ হইতে প্রতিহত করেন নাই-ফলে যুদ্ধ অনিবার্য হইল শেরখানের সহিত কুতুব খানের যুদ্ধ হইল-যুদ্ধে কুতুব খান নিহত হইলেন

 

কুতুব খানের পরাজয় এবং মৃত্যুতে বাংলার সুলতান গিয়াসউদ্দীন মামুদ শাহ ক্ষিপ্ত হইয়া উঠিলেন জালাল খান লোহানীও শের খানের বিজয়ে অপমান বোধ করিলেন-কারণ শেরখান তখনও বিহারের অধীন একজন সামান্য জায়গিরদার মাত্র জালাল খানের উদ্দেশ্য শেরখানের বিনাশ এবং গিয়াসউদ্দীনের লক্ষ্য মকদুম-ই-আলমের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ মাত্র মামুদ শাহ মকদুমের বিরুদ্ধে এক বিরাট বাহিনী প্রেরণ করিলেন-লোহানী সুলতান শেরখানের সৈন্যদলকে হাজীপুরে গমনের পথে বাধা দিলেনকারণ শের খান কুতুব খানের পরাজয়ে লুণ্ঠিত বিপুল ধনরত্নের কপর্দকও লোহানী সুলতানকে প্রদান করেন নাইশের খান হঁসসু খান নামক একজন বিশ্বস্ত সেনাপতিকে হাজীপুরে প্রেরণ করিলেন মকদুম তাঁহার সমস্ত ধনসম্পদ হঁসসু খানের নিকট গচ্ছিত রাখিলেন যুদ্ধে মকদুম-ই-আলম নিহত হইলেন৬৮ মামুদ শাহের প্রতিশোধস্পৃহা চরিতার্থ হইল হঁসসু খান মকদুমের গচ্ছিত ধনসম্পদ শের খানের হস্তে সমর্পণ করিলেন-ভবিষ্যতে এই অর্থ লোহানীদের বিরুদ্ধে নিয়োজিত হইয়াছিল

 

লোহানীগণ মকদুমের পরাজয় এবং শের খানের অর্থপ্রাপ্তির সংবাদে বিচলিত হইয়া তাঁহাকে হত্যা করিবার ষড়যন্ত্র করিলেন-কিন্তু বিফল হইলেন জালাল খান উপায়ান্তর না দেখিয়া গৌড়ের সুলতানের আশ্রয় যাচ্ঞা করিলেন এবং যুদ্ধের ছলে সসৈন্যে বঙ্গে প্রবেশ করিয়া জালাল খান লোহানী মুঙ্গেরে মামুদ শাহের আনুগত্য স্বীকার করিলেন এইবার মামুদ শাহ জীবনের ও সম্মানের শীর্ষস্থানে উন্নীত হইলেন-শত্রু মকদুম নিহত, হুমায়ন বাহাদুর শাহের সহিত ভারতের পশ্চিম প্রান্তে যুদ্ধে ব্যাপৃত, লোহানী বংশ তাঁহার বশংবদ, বিহার গৌড়ের আশ্রিত, বিহারের উদ্ধত জায়গিরদার শের খানও আইনত তাঁহার অধীন কিন্তু মামুদ শাহের ভাগ্যাকাশে একখণ্ড মেঘ তখন চঞ্চলগতিতে আবর্তন করিতেছিলকারণ, জালাল খান রাজ্যত্যাগ করিয়া বাংলায় আশ্রয় গ্রহণ করায় বিহারের শূণ্য সিংহাসন বিনাযুদ্ধে শের খানের হস্তগত হইল

 

মামুদ শাহের সেনাপতি কুতুব খানের পুত্র ইব্রাহিম এবং জালাল খান লোহানী বহু অশ্ব, পদাতিক, কামান সঙ্গে লইয়া মুঙ্গের হইতে জায়গিরদার শের খানের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করিলেন (১৫৩৪ খ্রিস্টাব্দের প্রথমভাগ)শের খানও কালবিলম্ব না করিয়া গৌড়রাজ্যের দিকে অগ্রসর হইলেন শেরখান চতুর্দিকে মৃন্ময় প্রাচীর নির্মাণ করিয়া শিবির সংস্থাপন করিলেন গৌড়-সেনাপতি ইব্রাহিম খান শের খানের শিবির অবরোধ করিয়া গৌড়েশ্বরকে আরও সৈন্য প্রেরণের জন্য অনুরোধ করিলেনশের খান কৌশল অবলম্বন করিলেন-তিনি দূতমুখে ইব্রাহিম খানকে সংবাদ প্রেরণ করিলেন যে, পরদিন প্রভাতে তিনি শিবির হইতে বহির্গত হইয়া যুদ্ধ করিবেন রাত্রিশেষে শের খান অল্প সংখ্যক সুশিক্ষিত সৈন্য শিবিরে রাখিয়া অবশিষ্ট সৈন্যসহ উচ্চভূমির অন্তরালে অপেক্ষা করিতে লাগিলেন প্রভাতে গৌড়ীয় সেনা শিবির আক্রমণ করিলে পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী শের খানের সৈন্য একবারমাত্র শর নিক্ষেপ করিয়া পৃষ্ঠপ্রদর্শন করিল আফগানগণ পলায়ন করিতেছে মনে করিয়া গৌড়ীয় সেনা তাহাদের পশ্চাদ্ধাবন করিলশের খান গুপ্তস্থান হইতে লুক্কায়িত সেনাদলসহ বহির্গত হইয়া গৌড়ীয় সেনা আক্রমণ করিলেন গৌড়ীয় সেনা রণে ভঙ্গ না দিয়া স্থির হইয়া দাঁড়াইল-ঘোরতর যুদ্ধ আরম্ভ হইল সুরজগড়ের যুদ্ধে ইব্রাহিম খান নিহত হইলেন সেনাপতি নিহত হইলে গৌড়ীয় সেনা পরাজিত হইল এবং গৌড়েশ্বরের কোষাগার, সমস্ত হস্তী ও তোপ শের খান কর্তৃক অধিকৃত হইল৬৯ জালাল খান পলায়ন করিয়া মামুদ শাহের আশ্রয় গ্রহণ করিলেন মামুদ শাহের ভাগ্যাকাশের মেঘখণ্ড ঘণীভূত হইয়া উঠিল মামুদ শাহের অপরাজেয় শক্তি আহত হইল-শেরখানের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল হইয়া উঠিল চতুর্দিক হইতে ভাগ্যান্বেষী আফগানগণ সুরজগড়-বিজেতা শেরখানের দিকে পার্শ্ব পরিবর্তন করিল-কারণ, আফগানগণ বিজয়ীর নিকট মস্তক অবনত করিতে বিন্দুমাত্রও দ্বিধা করে না“অস্তায়মান সূর্যের আলো অচিরে লুপ্ত হইয়া যায়”-এই প্রবাদবাক্য আফগানগণ অক্ষরে অক্ষরে বিশ্বাস করে এবং অনুসরণ করে

 

মামুদ শাহ এবং শের খান উভয়েই বুঝিতে পারিলেন যে, শেষ পর্যন্ত পূর্বাঞ্চলে একজনই অবশিষ্ট থাকিবেন মামুদ শাহের মনে শের খানের প্রতি প্রতিদ্বন্দ্বিতা অপেক্ষা ঘৃণার ভাবই অধিক ছিল-বাংলার সুলতানের দম্ভ আহত হইয়াছিল, তাঁহার রাজসম্মান ক্ষুণ্ন হইয়াছিল যুদ্ধের অব্যবহিত পরেই পুনরাক্রমণের ক্ষমতা আর তাঁহার ছিল না মামুদ শাহ পর্তুগীজ সাহায্যে বিরাট বাহিনী রচনা করিতে আরম্ভ করিলেনশের খানও অবশ্যম্ভাবী যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত ছিলেন কিন্তু হুমায়ুনের গতিবিধি লক্ষ্য না করিয়া শের খান অর্বাচীনের ন্যায় যুদ্ধে লিপ্ত হইলেন না১৫৩৬ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাসে বাহাদুর শাহের বিরুদ্ধে হুমায়ুন সসৈন্যে যুদ্ধযাত্রা করিলেন-শের খান নিশ্চিন্ত হইলেনএবার তিনি স্বয়ং গৌড়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ যাত্রা করিলেন (১৫৩৬ খ্রিঃ) তখনও বর্ষা আরম্ভ হয় নাই

 

তেলিয়াগড় গিরিবর্ত্ন তখনকার দিনে একটি বিশেষ গুরুত্বপুর্ণ প্রবেশ পথ বলিয়া পরিগণিত ছিল তেলিয়াগড়ের উত্তরে গঙ্গা, দক্ষিণে রাজমহল-তথা সাহেবগঞ্জ পর্বতমালা, মধ্যভাগে তিনক্রোশ পরিমিত উন্মুক্ত পথ বঙ্গে প্রবেশের এই সংকীর্ণ গিরিপথ ভিন্ন আর কোন পথ নাই জলপথে বঙ্গে প্রবেশ করা যাইত, কিন্তু সে পথ ছিল বিপদসংকুল ঝাড়খণ্ডের পার্বত্য পথ অপরিচিত-বন্যা পশু সমাকুল, কোথাও নিবিড় ঘর অরণ্য কোথাও বা খেরস্রোতা স্রোতস্বতী বনপথে বা পার্বত্যপথে একক মানুষ পদব্রজে চলিতে পারে, কিন্তু খাদ্য, রসদ ও যুদ্ধোপকরণ সঙ্গে লইয়া পর্বত অতিক্রম করা ছিল নিতান্তই বিপদজ্জনক ও কষ্টকরঅতএব তেলিয়াগড়ের গিরিপথের আশ্রয় ব্যতিরেকে কেহ বাংলার অভ্যন্তরে প্রবেশ করার কল্পনা করিতে পারিত না গিয়াসউদ্দীন বলবন, ফিরুজ তুঘলক প্রভৃতি অভিযানকারীরা তেলিয়াগড় অতিক্রম করিয়া বাংলায় প্রবেশ করিয়াছিলেন; সঙ্গে অনুসরণকারীগণ কেহবা নৌকাযোগে গঙ্গা অতিক্রম করিয়াছিল মামুদ শাহ তেলিয়াগড়ের গিরিবর্ত্ম সুরক্ষিত করিয়া নিশ্চিন্ত ছিলেন

 

শের খান প্রথমে তেলিয়াগড়ের পথে অগ্রসর হইলেন কিন্তু মামুদ শাহের সৈন্যগণ সে পথে অগ্রসর হইতে বাধাপ্রদান করিলশের খান পশ্চাৎপদ হইবার লোক ছিলেন নাতিনি কার্যক্ষেত্রে নূতন উপায় নির্বাচন করিলেন তাঁহার পুত্র জালাল খানকে একদল সৈন্যের অধিনায়ক নিযুক্ত করিয়া তেলিয়াগড়ের প্রত্যন্তদেশে অবস্থান করিতে নির্দেশ দিলেন তাঁহার উদ্দেশ্য ছিল খণ্ড খণ্ড যুদ্ধে গৌড়ের সৈন্যদলকে ব্যাপৃত রাখিবেন-যেন কোন সন্দেহের উদ্রেক না হয় স্বয়ং শের খান ঝাড়খণ্ডের পার্বত্য পথে বহু সৈন্য-রসদ নষ্ট করিয়া গৌড়ের প্রান্তে উপস্থিত হইলেন৭০ অবশ্য ঝাড়খণ্ডের রাজার হস্তিবাহিনীর সাহায্য তিনি লাভ করিয়াছিলেন মামুদ শাহ স্বপ্নেও কল্পনা করিতে পারেন নাই যে, কোন সৈন্যবাহিনী ঝাড়খণ্ডের পথে তেলিয়াগড়কে পশ্চাতে রাখিয়া গৌড়ের অভ্যন্তরে প্রবেশ করিতে পারে দুঃসাহসী শের খান জীবন সংগ্রামে সমস্ত বাধা-বিপত্তিকে তুচ্ছ করিয়া উদ্দেশ্য সাধণের জন্য জীবন পণ করিয়াছেন মামুদ শাহ শত্রু  সৈন্যের অতর্কিত ও আকস্মিক উপস্থিতিতে চকিত, ভীত ও সন্ত্রস্ত হইয়া পড়িলেন নিজেকে নিরুপায় বিবেচনা করিয়া তিনি সন্ধির প্রস্তাব করিলেন ইখতিয়ার উদ্দীন মুহম্মদ বখতিয়ার খালজীও এই অপ্রত্যাশিত পথেই বঙ্গে প্রবেশ করিয়া তদানীন্তন-বঙ্গ-নরপতি লক্ষ্মণসেনকে অতর্কিতে আক্রমণ করিয়া বিভ্রান্ত করিয়াছিলেন লক্ষ্মণসেন পলায়ন করিয়া আত্মরক্ষা করিয়াছিলেন-মামুদ শাহ সন্ধি স্থাপন করিয়া আত্মরক্ষা করিলেন প্রায় তিন শত চল্লিশ বৎসর পরে আবার ঐতিহাসিক ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটিল

 

গিয়াসউদ্দীন মামুদ শাহের পর্তুজীজ বন্ধুগণ এই সন্ধির প্রস্তাব সমর্থন করিলেন না তাঁহারা আত্মরক্ষাত্মক যুদ্ধ করিয়া কালক্ষেপ করিতে পরামর্শ দিলেনকারণ, বর্ষাকাল পর্যন্ত যদি শের খানকে গৌড়ের প্রান্তে যুদ্ধে ব্যাপৃত রাখা যায়, তবে ঘন বর্ষায় বাংলার নদীপথ প্লাবিত হইয়া যাইবে; শের খানের প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনা থাকিবে না-অল্পায়াসে শক্রকে বিনাশ করা যাইবে বাংলার নদনদী বহুবার বাঙালিকে দিল্লির আক্রমণ হইতে রক্ষা করিয়াছে আসামের নদনদী বহুবার আসামকে রক্ষা করিয়াছে কিন্তু মামুদ শাহ অতীত স্মৃতি বিস্মৃত হইয়াছিলেনতিনি অনিশ্চিত বর্ষার জন্য অপেক্ষা করিতে ভরসা পাইলেন নাশের খান যে বঙ্গে তাহার এই ভৌগোলিক বা প্রাকৃতিক অসুবিধার বিষয় অবহিত ছিলেন না তাহা নহে সুতরাং তিনি মামুদ শাহের সন্ধির প্রস্তাব সানন্দে গ্রহণ করিলেন পর্তুগীজ বিবরণ অনুসারে তের লক্ষ সুবর্ণ মুদ্রার বিনিময়ে শের খান গৌড় আক্রমণ না করিয়া প্রত্যাবর্তন করিলেন তেলিয়াগড়ের গিরিপথ শের খানের অধিকারভুক্ত হইল

 

এই সময়ে শের খান কৌশলে চূণার দুর্গ অধিকার করিলেন; ইহা একটি নাটকীয় ব্যাপার সুলতান ইব্রাহীম লোদীর রাজত্বকালে বৃদ্ধ তাজ খান চূণার দুর্গের কিল্লাদার নিযুক্ত হইয়াছিলেন বৃদ্ধ বয়সে লাদ মালিকা নাম্নী এক রূপসী তরুণীর রূপমুগ্ধ হইয়া তাজ খান তাঁহাকে বিবাহ করিলেন; ফলে তাজ খানের প্রাপ্তবয়স্ক পুত্রগণ লাদ মালিকার প্রতি অত্যন্ত রুষ্ট হনতাজ খানের জ্যেষ্ঠ পুত্র লাদ মালিকাকে অপমান করেনপিতা তাজ খান ক্রুদ্ধ হইয়া পুত্রকে হত্যা করিতে উদ্যত হন পিতা-পুত্রের বিবাদে পিতা নিহত হইলেনলাদ মালিকা অতিশয় বুদ্ধিমতী এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষিণী ছিলেনতিনি অর্থ দ্বারা সৈন্যদের বশীভূত করিয়া চূণার দুর্গের অধিকার অব্যাহত রাখিলেনশের খান এই সংবাদ পাইয়া লাদ মালিকাকে সাহায্য করিতে অগ্রসর হইলেন-অবশ্য লাদ মালিকারও সাহায্যের প্রয়োজন ছিলশের খানের সাহায্য লাদ মালিকাকে রক্ষা করিললাদ মালিকা শের খানকে বিবাহ করিয়া নিজের স্বার্থ সুদৃঢ় করিলেন-প্রভূত অর্থ ও চুণার দুর্গ শের খানের হস্তগত হইল

 

গিয়াসউদ্দীন মামুদ শাহ পুনরায় শের খানের সহিত প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য প্রস্তুত হইতে আরম্ভ করিলেন মামুদ শাহ শক্তি সঞ্চয়ের উদ্দেশ্যে পর্তুগীজগণকে সাহায্যের জন্য অনুরোধ করিলেন পর্তুগীজগণ এক বৎসর পরে সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিল শের খান পর্তুগীজ প্রতিশ্রুতি এবং মামুদ শাহের প্রস্তুতির সংবাদ অবগত হইয়া সময় নষ্ট না করিয়া তেলিয়াগড়ের পথে গৌড়ে অভিযান প্রেরণ করিলেন-কারণ দেখাইলেন-মামুদ শাহ প্রতিশ্রুত কর প্রদান করেন নাই

 

অন্যদিকে শের খানের এই ঔদ্ধত্য এবং সামরিক অভিযানে ধৈর্যচ্যুত হইয়া হুমায়ুন পূর্বাঞ্চলে অগ্রসর হইলেনশের খানের পক্ষে পূর্বে বঙ্গ-সীমান্তে এবং পশ্চিমে বিহার সীমান্তে যুগপৎ যুদ্ধ পরিচালনার জন্য অত্যন্ত সংকটময় পরিস্থিতির উদ্ভব হইলশের খান তাঁহার পুত্র জালাল খান এবং অভিজ্ঞ সেনাপতি খাওয়াস খানকে গৌড় অবরোধের আদেশ প্রদান করিয়া স্বয়ং হুমায়ুনের অগ্রগতি প্রতিহত করিবার উদ্দেশ্যে পশ্চিমে সৈন্য পরিচালনা করিলেন হুমায়ুন সোজাসুজি বঙ্গাভিমুখে সৈন্য পরিচালনা করিলে মামুশাহ অনেকটা নিশ্চিন্ত হইতেন; কিন্তু শের খান কৌশলে হুমায়ুনকে অর্ধপথে [ চূণার অবরোধ করিতে বাধ্য করিলেন উদ্দেশ্য - হুমায়ুনকে যত দিন বেশি সম্ভব চূণারে ব্যাপৃত রাখিবেন ইতোমধ্যে জালাল খান ও খাওয়াস খান গৌড় বিজয় সম্পন্ন করিবেন

 

শের খানের কৌশল ও রণনীতি সফল হইল হুমায়ুন চূণার যুদ্ধে ব্যাপৃত রহিলেন ইতোমধ্যে মামুদ শাহের রাজধানী গৌড়ে খাদ্যাভাব উপস্থিত হইল মামুদ শাহ যুদ্ধ করিতে বাধ্য হইলেন যুদ্ধে আহত হইয়া মামুদ খান কোনমতে উত্তর-বিহারে পলায়ন করিয়া প্রাণরক্ষা করিলেন বিজয়ী জালাল খান গৌড় নগরী অধিকার করিলেন (৯৪৪/১৫৩৮, ৬ই এপ্রিল) মামুদ শাহের দুই পুত্র বন্দী হইলেন৭৩

 

চূণার অবরোধের জন্য শের খান প্রস্তুত ছিলেন এবং সেইভাবে দুর্গরক্ষার্থ আয়োজন করিয়াছিলেন হুমায়ুন চূণার দুর্গ অধিকার করিয়া গৌড়াভিমুখে অগ্রসর হইলে শেষ পর্যন্ত শের খান সন্ধির প্রস্তাব করিলেন; শর্ত হইল-শের খানের বঙ্গে অধিকৃত স্থানের উপর শের খানের অধিকার স্বীকৃত হইবে, বিহারে অধিকৃত অঞ্চল দিল্লির অধীন থাকিবে-শের খান তাঁহাকে কর প্রদান করিবেন

 

এইবার মামুদ শাহ কিঞ্চিৎ বুদ্ধির পরিচয় প্রদান করিলেনতিনি শের খানের বিরুদ্ধে হুমায়ুনের সাহায্য প্রার্থনা করিলেন এবং শের খানের সঙ্গে সন্ধি ভঙ্গ করিতে পরামর্শ দিলেন৭৪ দিল্লি ও গৌড়ের সম্মিলিত সৈন্য সহযোগে শের খানকে আক্রমণ করিলে আফগান ধ্বংস সম্ভব বলিয়া নিবেদন করিলেন হুমায়ুন এই পরামর্শ গ্রহণযোগ্য বিবেচনা করিয়া শের খানের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করিলেন মামুদ শাহ হুমায়ুনের সাথে সাক্ষাৎ করিলেন হুমায়ুন কিন্তু মামুদ শাহকে রাজোচিত সম্মান প্রদর্শন বা অভ্যর্থনা করেন নাই৭৫ মামুদ শাহের সৈন্যগণ হুমায়ুনের সেনাবাহিনীর সহিত তেলিয়াগড়ের পথে অগ্রসর হইল জালাল খান ও খাওয়াস খান তেলিয়াগড়ের গিরিপথে এক মাসকাল হুমায়ুনের গতিরোধ করিয়াছিলেন৭৬ তেলিয়াগড় অধিকৃত হইলে হুমায়ুন পুনরায় গৌড়াভিমুখে অগ্রসর হইলেনপথে ভাগলপুরের নিকট কহলগ্রামে হতভাগ্য সুলতান মামুদ শাহ সংবাদ পাইলেন যে, তাঁহার যে দুই পুত্র গৌড়ে বন্দী হইয়াছিলেন-তাঁহাদিগকে হত্যা করা হইয়াছে নিদারুণ মনস্তাপে, অসহ্য শোকে, নিস্ফল আক্রোশে গৌড়াধিপতি হুমায়ুনের শিবিরেই ইহলীলা সংবরণ করিলেন (৯৪৪/১৫৩৮ খ্রিঃ)৭৭

 

গিয়াসউদ্দীন মামুদের চরিত্র ও কৃতিত্ব

 

মামুদ শাহের রাজত্বকাল অত্যন্ত ঘটনাবহুল। পাঁচ বৎসর রাজত্বকালের মধ্যে অতি অল্পদিনই তিনি নিশ্চিন্তে কালাতিপাত করিতে পারিয়াছিলেন ভ্রাতস্পুত্রের রক্তে রঞ্জিত সিংহাসনে আরোহণ করিলেন বটে, কিন্তু সে সিংহাসন তাঁহার পক্ষে কণ্টকশয্যাই হইয়াছিল তাঁহার অধীন মালিক মকদুম-ই-আলম প্রথম দিন হইতেই শত্রুতা আরম্ভ করিয়াছিলেন এবং আমরণ মামুদ শাহকে বিব্রত রাখিয়াছিলেন মৃত্যু দিনে তাঁহার সমস্ত ধনসম্পদ দুর্ধর্ষ শত্রু শের খানের হস্তে সমর্পণ করিয়া শত্রুর শক্তি বৃদ্ধি করিয়াছিলেন বুদ্ধির দোষে মামুদ শাহ গুজরাট সুলতান বাহাদুর শাহের সহিত মৈত্রীবন্ধন সুদৃঢ় করিতে পারেন নাই; শের খানের সহিত যোগদান করিয়া হুমায়ুনকে বিব্রত করেন নাই জালার খান লোহানী ছিলেন সমসাময়িক সুলতানদের মধ্যে দুর্বলতম, তাঁহার আফগান সর্দারগণ ছিলেন চঞ্চলবুদ্ধি মামুদ শাহ দুর্ভাগ্যবশত তাহাদের সঙ্গে মৈত্রী স্থাপন করিলেন; নিজের অগোচরে শের খানকে করিলেন শত্রু অন্যদিকে তাঁহার চরম দুর্ভাগ্য যে, শের খানের মত কূটবুদ্ধি, সুকৌশলী, বিচক্ষণ সেনানায়কের সঙ্গে তাহাকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করিতে হইয়াছিল অবশ্য লোহানীর সঙ্গে যোগ না দিয়া শের খানের মত বিশ্বাসঘাতকের সহিত বন্ধুত্ব করিলেও শেষ পর্যন্ত মামুদ শাহ বাংলাদেশ রক্ষা করিতে পারিতেন কি না সন্দেহ

 

ব্যক্তিগত চরিত্রের দিক দিয়াও মামুদ শাহ ছিলেন অস্থিরবুদ্ধি, ভীরু, কাপুরুষ, অদূরদর্শী এবং ইন্দ্রিয়াসক্ত তাঁহার হারেমে ‘দশ সহস্র’ নারী ছিল পর্তুগীজ ইতিহাসে উল্লেখ আছে যে, সংখ্যায় দশ সহস্র না হইলেও অসংখ্য নারী তাঁহার অন্তঃপুরে আবদ্ধ ছিল-এ বিষয়ে সন্দেহ নাই মামুদ পিতা বা ভ্রাতার কোন গুণের অধিকারী ছিলেন না-ঘটনাচক্রে তাঁহাকে পশ্চিমে হুমায়ুন এবং পূর্বে শের খানের ন্যায় শত্রুর সহিত প্রতিযোগিতা করিতে হইয়াছিল - কিন্তু তাঁহাদের সহিত প্রতিদ্বন্দ্বিতা করিবার যোগ্যতা তাঁহার ছিল না

 

শেষ অনুচ্ছেদ

 

হুসেন শাহী বংশ প্রকৃতপক্ষে বঙ্গের যথার্থ মুসলিম রাজবংশ হুসেন শাহ  বাঙালি-একথা তিনি বিস্মৃত হন নাইতিনি বাংলাকে দিল্লির রাজ্যাংশরুপে কল্পনা করেন নাই তাঁহার রাজত্বতালে বঙ্গের সীমা পূর্বে কামরূপ, দক্ষিণে ত্রিপুরা এবং পশ্চিমে আজমগড়ের পশ্চিমাংশ পর্যন্ত বিস্তৃত হইয়াছিলতিনি সিকান্দর লোদীকে বাংলার সহিত সম্মানজনক শর্তে সন্ধি করিতে বাধ্য করিয়াছিলেন তাঁহার পুত্র নসরৎ শাহ দিল্লির বাদশাহ বাবরকে সম্মানজনক শর্তে সন্ধি করিতে বাধ্য করিয়াছিলেনএমন কি চতুর-চূড়ামণি শের খান পর্যন্ত মামুদ শাহের সঙ্গে দীর্ঘকাল যাবৎ প্রত্যক্ষ সংগ্রামে সম্মুখীন হইতে সাহস করেন নাই হুমায়ুন যদি চূনারে বিলম্ব না করিয়া বঙ্গদেশে উপস্থিত হইতেন এবং মামুদ শাহের সঙ্গে যোগদান করিতেন, তবে সম্ভবত মুঘল ইতিহাসের প্রারম্ভ অন্যরুপে রচিত হইত এবং শূর বংশের উদ্ভব নাও হইতে পারিত মামুদ শাহকে ভীরু কাপুরুষ বলিয়া কলঙ্কিত করা হয় বটে, কিন্তু একদিকে শের খান, অন্যদিকে হুমায়ুন এবং মধ্যস্থলে অনিশ্চিত, অশান্ত, অনমনীয় আফগান জায়গিরদারদের উপর নির্ভর করিয়া মামুদ শাহের পক্ষে অগ্রসর হওয়া অত্যন্ত কঠিন ব্যাপার ছিলযাহা হউক, হুসেন শাহী বংশের সময়ে বাংলার গৌরব যেমন সমস্ত উত্তর-ভারতে বিস্তৃত হইয়াছিল, তেমনই এই বংশের সময়েই স্বাধীন বাংলার অস্তিত্ব চিরতরে বিনষ্ট হইয়াছিল মাত্র কয়েক বৎসরের জন্য শূর বংশ ও কররানী বংশ বঙ্গে রাজত্ব করিয়াছিল-তারপর বঙ্গদেশ দিল্লি সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত একটি সুবা বা প্রদেশে পরিণত হইল

 

হুসেন শাহী বংশ আরব হউক আর বাঙালি হউক কর্মে ও চিন্তায় মুসলমানের সহজাত ধর্মের বিলাস বাদ দিয়া বিচার করিলে বঙ্গদেশের হিতাকাঙ্ক্ষীরূপে গৌরবের আসন তাঁহাদেরই প্রাপ্য তাঁহাদের মনে কোন বহির্ভারতীয় প্রেম ছিল না তাঁহারা বাংলাদেশকে ভালবাসিয়াছেন, বাংলার কল্যাণ কামনা করিয়াছেন, বাংলা ভাষাকে মাতৃভাষা বলিয়া উৎসাহিত করিয়াছেন তাঁহারা হিন্দুদিগকে উচ্চ রাজপদে নিযুক্ত করিয়াছেন, হিন্দুদের বিশ্বাস করিয়া সচিবপদে উন্নীত করিয়াছেন, সেনাপতির দায়িত্ব অর্পণ করিয়াছেন হিন্দু কবিদিগকে উৎসাহিত করিবার জন্য তাঁহারা উপাধি দান করিয়াছেন হিন্দু রাজা ও জমিদারগণ দিল্লির বাদশাহ বা বিহারের সুলতানের বিরুদ্ধে বাংলার সুলতানের পক্ষে যুদ্ধ করিয়া প্রাণ বিসর্জন দিয়াছেন-ইহাও হুসেন শাহী বংশের কম কৃতিত্বের পরিচায়ক নহে

 

     q হুসেনশাহী বংশের রাজত্বকালে বঙ্গদেশ (মানচিত্র)

 

 

 

 

 

পাদটীকা:

 

১.   Riyaz-us-Salatin, Egn. Tr., Pp. 131-32        Back to main text

২.   JASB, 1874, Pp. 222-23        Back to main text   

৩.   গৌড়ের ইতিহাস, প্রথম খণ্ড, ১০৪-১১ পৃষ্ঠা ।        Back to main text

৪.   Muntakhab-ut-Tawarikh – English tr., Pp.16-17        Back to main text

৫.   Badani, vol.I, p.319        Back to main text

৬.   Gait’s History of Assam, Pp. 87-92        Back to main text

৭.   Gait’s – History of Assam, p.45        Back to main text

৮.   Gait’s – History of Assam, p.41        Back to main text

৯.   Ibid p.43        Back to main text

১০.  B. Hamilton, Vol. II, Pp. 458-49        Back to main text

১১.  Riyaz-us-Salatin, Egn. tr., p. 134        Back to main text

১২.  JASB, - 1874, 79, p.335        Back to main text

১৩.  JASB-Old Series, 1872, pt. I, p.79        Back to main text 

১৪.  Gait’s History of Assam, p.83        Back to main text

১৫.   Ibid, p.87        Back to main text

১৬.   Riyaz-us-Salatin. Eng. Tr. p.132        Back to main text

১৭.   রজনীকান্ত চক্রবর্তী, গৌড়ের ইতিহাস, ২য় খন্ড, ১০৯ পৃ:        Back to main text

১৮.   JASB, Old Series LXIX. 1900. Pt. I, p. 186        Back to main text

১৯.   চৈতন্য চরিতামৃত, আদিলীলা - ১৩শ পরিচ্ছেদ, ৫৯ পৃষ্ঠা        Back to main text

২০.   অমিয় নিমাইচরিত, ৩য় খণ্ড - ৭৭-৭৯ পৃঃ        Back to main text

২১.   অমিয় নিমাইচরিত, ৪র্থ খণ্ড - ২৩৩ - ৩৭ পৃঃ        Back to main text

২২.   চৈতন্য ভাগবত, অন্ত্যখণ্ড, ২য় অধ্যায়, ৩৮১-৮৭ পৃঃ        Back to main text

২৩.   A.W. Botham, Catalogue of Coin Cabinet-Assam, P.170, No,-18        Back to main text

২৪.   JASB-Old Series. Vol. XLI, 1872. Pp. 333-334        Back to main text       

২৫.   রাজমালা - পৃঃ ৪৩-৫০, Tripura Gazetteer, P.13        Back to main text

২৬.   JASB, 1873, P.333        Back to main text

২৭.   রাজমালা, ৫৪৫ - ৪৬ পৃষ্ঠা        Back to main text

২৮.   Hamidullah, Ahadis-ul-khwanin, P. 17-18        Back to main text

২৯.   Riyaz-us-Salatin, Eng. Tr. P.133        Back to main text

৩০.   বাঙ্গলার ইতিহাস - রাখালদাস বন্দোপাধ্যায়, ২য় খণ্ড, ২৫৩ পৃঃ        Back to main text

৩১.   Riyaz-us-Salatin, Eng. Tr. P.134        Back to main text

৩২.   JASB, 1871, p.256. JASB, 1873, p.295        Back to main text

৩৩.   বাঙ্গলার ইতিহাস, রাখালদাস বন্দোপাধ্যায়, ২য় খণ্ড, ২৫৩-২৬১ পৃঃ        Back to main text

৩৪.   Dinesh Ch. Sen, Hist. of Bengali language and literature, p. 279 (Note)        Back to main text

৩৫.   Ibid, p.202 (Note)        Back to main text

৩৬.   D.C. Sen – Hist. of Bengali Language and literature, p.202 (Note)        Back to main text

৩৭.   Ibid P.222        Back to main text

৩৮.   JASB – New series, Vol. V. p.253        Back to main text

৩৯.   D.C. Sen, Hist. of Bengali language & literature, P.12 (note 3.)        Back to main text

৪০.   পারস্য ভাষায় রচিত ইতিহাস অনুসারে নসরৎ শাহের অপর নাম নসীব শাহ        Back to main text

৪১.   Habibullah, P.153        Back to main text

৪২.   Ryaz-us-Salatin, Eng. Tr. P.136        Back to main text

৪৩.   History of Bengal, D.U., Vol. II. P.153 (Foot note1)        Back to main text

৪৪.   গৌড়ের ইতিহাস, ২য় খণ্ড, ১৫১ পৃঃ        Back to main text

৪৫.   Babar, Vol. III, P.652        Back to main text

৪৬.   Riyaz-us-Salatin, P.138        Back to main text

৪৭.   Elphinstone, History of India, 9th Edn., P.245        Back to main text

৪৮.   Babar, Vol. III, Pp. 659-676        Back to main text

৪৯.   গৌড়ের ইতিহাস, ২য় খণ্ড, ১৫১ পৃষ্ঠা        Back to main text

৫০.   Babar, Vol. III, Pp. 669-74        Back to main text

৫১.   গৌড়ের ইতিহাস, ২য় খণ্ড, ১৫১ পৃষ্ঠা        Back to main text

৫২.   Eliot, History of India, Vol. IV, Pp, 349-50        Back to main text

৫৩.   Gait’s History of Assam, Pp. 87-90        Back to main text

৫৪.   Ryaz-us-Salatin, Eng. Tr. P.136        Back to main text          

৫৫.   D.C. Sen – History of Bengali Language and literature p.204        Back to main text

৫৬.   D.C. Sen – History of Bengali Language and literature p.202        Back to main text

৫৭.   Epigraphic Indo-moslemica 1911-12, Pp. 5-7        Back to main text

৫৮.   JASB, Old series, 1873, p. 296        Back to main text

৫৯.   Revenshaw, Gour-its ruins and inscriptions, p.15        Back to main text

৬০.   JASB, Old Series, 1872, p.338        Back to main text

৬১.   Ryaz-us-Salatin, Eng. Tr., p.137        Back to main text

৬২.   Catalogue of Coins in the Indian museum-Cal. Vol. II, P.179        Back to main text  

৬৩.   Ryaz-us-Salatin, Eng. Tr. P.138        Back to main text

৬৪.   Ryaz-us-Salatin, Eng. Tr., p.138        Back to main text

৬৫.   Elliot, Hist. of India Vol. IV, p.333        Back to main text

৬৬.   Ibid, Elliot, Vol. IV. P.133        Back to main text

৬৭.   Ryaz-us-Salatin, Eng. Tr. P.138        Back to main text

৬৮.   Ryaz-us-Salatin, Eng. Tr., P.138,  Elliot, Vol. IV. P.134        Back to main text

৬৯.   Elliot, Vol. IV. Pp. 338-339        Back to main text

৭০.   Ahmad Yadger, op. cit. 183, Quanango, Pp. 120-124        Back to main text

৭১.   History of Bengal, D. U., Vol. II, P. 163        Back to main text

৭২.   Campos, p. 40        Back to main text

 

   

ৎস:  "বঙ্গদেশের ইতিহাস - মধ্যযুগ: প্রথম পর্ব " - সুশীলা মণ্ডল।  অরিত্র প্রকাশনা, বাংলাবাজার, ঢাকা।